সুন্নাত কি হাদিস ও সুন্নাতের পার্থক্য কি? (পর্ব ১)

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে শুরু করছি
সুন্নাত কি হাদিস ও সুন্নাতের পার্থক্য কি? (পর্ব ১)


বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। শান্তি অবতীর্ণ হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লামের) উপর। লিখাটি একটু সময় দিয়ে পড়ুন প্লিজ ... তা নাহলে মূল্যবান কিছু মিস করবেন ! একজন বিজ্ঞ আলেমের একটি লেকচার ও বই থেকে সংগ্রহ করে একটি নোট তৈরি করলাম। আমি পোস্ট বা নোটে আলেমের নাম এই কারনেই উল্লেখ করিনা কারন এতে মানুষ ব্যক্তি কেন্দ্রিক একদিকে ঝুকে পড়তে পারে, আর এতে ব্যক্তিকে বা আলেমকে অন্ধ অনুসরন তৈরি হয়। এতে তারা ঐ আলেমকেই ১০০% হক মনে করে, আর তখন তার সামনে কুরআন ও হাদিস থেকে কিছু সত্য পেশ করলে সে নিতে পারেনা। এতে ইসলামের নামে অনেক দল তৈরি হয়। তাই আমি শুধুমাত্র ছোট আকারে লিখাটা পেশ করলাম। এখানে অনেক বিষয়ে আমি ইচ্ছা করেই হাদিসের রেফারেন্স দেইনি কারন এই হাদিসগুলো খুবই পরিচত। যারা অন্তত কুরআন হাদিসের প্রাথমিক ধারনা রাখেন তারাও বুঝতে পাড়বেন। যারা একদম নতুন তারা অন্তত এই নোট দুই তিনবার পড়বেন তারপর কুরআন এর অনুবাদ পড়ে মিলিয়ে নিবেন। সুন্নাত ও হাদিসের ব্যপারে আমাদের মাঝে অনেক বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আছে। তাই আমরা যদি একটু সহজে ছোট আকারে একটু পড়াশুনা করে সুন্নাহ ও হাদিসের ব্যপারটি বুঝে নেই তবে আমাদের জন্য দ্বীন বুঝতে সহজ হবে।


সুন্নাত কি হাদিস ও সুন্নাতের পার্থক্য কি? (পর্ব ১)


বেশিরভাগ মানুষ মনে করে এই দ্বীন (জীবন বিধান) ইসলাম আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমেই প্রচার শুরু হয়েছে ! আসলে এই দ্বীন ইসলাম আদম (আঃ) এর সময় থেকেই যাত্রা শুরু হয়েছিলো। প্রত্যেক নবী-রাসূল এই একই দ্বীন প্রচার করেছেন। এবং আল্লাহ্‌র কাছেও সবসময় একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীন ছিলো ইসলাম । আল্লাহ্‌ বলেনঃ নিশ্চয় আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন হল ইসলাম। (আলে-ইমরান ৩/২১) এবং আল্লাহ্‌ এটাও বলে দিয়েছেন যে কেয়ামতের সময়ে আল্লাহ্‌ এই দ্বীন ইসলাম ছাড়া আর কোন দ্বীন কবুল করবেন না। (৩:৮৫) এই একই দ্বীন আল্লাহ্‌ অতীতের নবীরসূলদের দিয়েছিলেন, আল্লাহ্‌ বলেনঃ তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই বিধি-ব্যবস্থাই দিয়েছেন যার হুকুম তিনি দিয়েছিলেন নূহকে। আর সেই (দ্বীনই) তোমাকে ওয়াহীর মাধ্যমে দিলাম যার হুকুম দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে- তা এই যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠিত কর, আর তাতে বিভক্তি সৃষ্টি করো না, ব্যাপারটি মুশরিকদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে যার দিকে তুমি তাদেরকে আহবান জানাচ্ছ। ( আশ-শূরা ৪২/১৩) আর মুমিনদের একটি কালেমা (শাহাদাৎ ও বিশ্বাস) এটাও হবে যে তারা নবী রাসুলদের ব্যপারে পার্থক্য করবে না। আল্লাহ্‌ বলেনঃ তারা সবাই আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাদের উপর, তাঁর কিতাবসমূহের উপর এবং রসূলগণের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে, (তারা বলে), আমরা রসূলগণের মধ্যে কারও ব্যাপারে তারতম্য করি না। (সূরা বাকারা ২/২৮৫)

নবীরাসূলদের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ যেই দ্বীন দিয়েছেন তার একটি অংশ হচ্ছে ঈমানের (বিশ্বাস) ও আখলাকের (চরিত্র) সাথে সম্পৃক্ত। যেটাতে কোনদিন পরিবর্তন হয়নি। সবসময় একই রকম ছিলো। যেমনঃ এই পৃথিবীর একজন সৃষ্টিকর্তা আছে। তিনি পরিক্ষা করার জন্য মানুষ ও জীনজাতি সৃষ্টি করেছে। তার নিকট আমাদের একদিন ফিরে যেতে হবে এবং প্রত্যেক কর্মের হিসাব-নিকাশ হবে। তিনি মানুষের হেদায়েতের জন্য নবী রাসূল প্রেরন করেছেন এবং তাদের উপর কিতাব ও সহায়কও (হিকমাহ) দিয়েছেন। নবী রাসূলগন এই কিতাবের মাধ্যমে মানুষের মাঝে তাদের বিভিন্ন বিষয়ের সমাধান দিয়েছেন। এবং আল্লাহ্‌র এই কিতাব আল্লাহ্‌র ফেরেশতারা নবীরাসূলের কাছে নিয়ে আসতেন। এই দাওয়াতগুলো প্রত্যেক নবী রাসুলই মানুষকে প্রচার করতেন।তেমনিভাবে

আরেকটি বিষয় হচ্ছে মানুষের আখলাক বা চরিত্রের পরিশুদ্ধির সাথে সম্পৃক্ত। আর কুরআন বলছে এতেও কোন পরিবর্তন হয়নি। প্রত্যেক নবী ও রাসুলের ক্ষেত্রে একইরকম ছিলো। যেই ব্যপারটা আল্লাহ্‌ হিকমাহ ( বিশেষ জ্ঞান ) শব্দে উল্ল্যেখ করেছেন। কুরআন বলে- ‘’তাদের থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যে তাদের প্রতি আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবে আর তাদেরকে পবিত্র করবে।’’ (বাকারা ২/১২৯)। ‘’আমি ইবরাহীমের বংশধরকে কিতাব ও হিকমত দান করেছি।’’ (নিসা ৪/৫৪) ‘’যেভাবে আমি তোমাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি তোমাদের মধ্য থেকে, যে তোমাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে, তোমাদেরকে পবিত্র করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়।’’ (বাকারা ২/১৫১) ‘’আর তোমরা স্মরণ কর তোমাদের উপর আল্লাহর নিআমত এবং তোমাদের উপর কিতাব ও হিকমত যা নাযিল করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন।’’ (বাকারা ২/২৩১) ইউসুফ আঃ এর ব্যপারে আল্লাহ্‌ বলেনঃ ‘’আর সে যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হল, আমি তাকে হিকমত ও জ্ঞান দান করলাম এবং এভাবেই আমি ইহসানকারীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।’’ (ইউসুফ ১২/২২) ‘’আর যখন ঈসা সুস্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে আসল, তখন সে বলল, আমি অবশ্যই তোমাদের কাছে হিকমত নিয়ে এসেছি এবং এসেছি তোমরা যে কতক বিষয়ে মতবিরোধে লিপ্ত তা স্পষ্ট করে দিতে। (যুখরুফ ৪৩/৬৩) এমন অনেক আরো অনেক আয়াত আছে হিকমত সম্পর্কে যেই জ্ঞান আল্লাহ্‌ কুরআনের পাশাপাশি প্রত্যেক নবীরাসূলকে দিয়েছেন আর সেটা দিয়েই উনারা মানুষকে পরিশুদ্ধ করতো।

ইসলামের দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় হচ্ছে আইনকানুন বা জীবনবিধান। যেটাকে কুরআনের ভাষায় কিছু জায়গায় ‘কিতাব’ বলা হয়েছে আর কিছু যায়গায় ‘শরীয়ত’ বলা হয়েছে। সোজা কথায় শরীয়ত মানে আল্লাহ্‌র দেওয়া জীবন বিধান। তো এই বিষয়ে কুরআন বলছে যে যুগে যুগে মানুষের সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রত্যেক নবীর সময়েই কিছুটা পরিবর্তন করা হত। এই শরীয়ত বা জীবনবিধানের একটি অংশ আল্লাহ্‌র সাথে সম্পৃক্ত । যেমন বিভিন্ন ইবাদাত করার নিয়মনিতি বা বিধান যেটা আল্লাহ্‌র সাথেই সম্পৃক্ত। আর এতে তেমন পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয়নি। আরেকটি বিষয় হচ্ছে মানুষের সাথে সম্পৃক্ত (সামাজিক) বিষয়। এই অংশে বিভিন্ন জাতির প্রেক্ষাপট ও অবস্থার বিবেচনা করে আল্লাহ্‌ পরিবর্তন করেছেন নবী রাসূলদের মাধ্যমে। তো দ্বীনের যেই অংশ (ইবাদাতের অংশ) কোন পরিবর্তন করা হয়নি সেটা প্রত্যেক নবীদের সময়ে এইভাবেই চলে এসেছে। আর যেই অংশ (সামাজিকতার সাথে সম্পৃক্ত বিধিবিধান) পরিবর্তন করা হয়েছে সেটা প্রত্যেক জামানায় তাদের নবী রাসূল এসে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। পূর্বের একই দ্বীন ধারাবাহিকভাবে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এইভাবেই পৌঁছেছে। দ্বীনের যেই অংশের কোন পরিবর্তন ঘটেনি সেটা আদম আঃ থেকে শুরু করে প্রত্যেক নবী রাসুলের সময়ে একইরকম ছিলো আর এইভাবেই চলে এসেছে। এবং ইবরাহিম (আঃ) এর মাধ্যমে আরবেও এই একই দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। ইবরাহিম (আঃ) এর সন্তানদের মধ্যে ‘বনু ইসরাইল’ ও ‘বনু ইসমাঈল’ যেই দ্বীন প্রচার করেছিলেন সেই একই দ্বীন আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লামও প্রচার করেছেন। আপনারা নিশ্চয়ই রাসুল সঃ এর সাহাবী আবু যর আল-গিফারির নাম শুনেছেন। উনি ‘’ মুসলিম’’ এ বড় একটি হাদিসে উনার ঈমান আনার পুরো ঘটনা তুলে ধরেছেন , সেখানে তিনি ঈমান আনার পূর্বের ঘটনায় বলেন- ‘’ আবূ যার (রাঃ) বললেন, হে ভ্রাতুষ্পূত্র ! আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে সাক্ষাতের তিন বছর পূর্বে সালাত আদায় করেছি। আমি (রাবী) বললাম, কার জন্যে ? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্যে। ‘’( মুসলিম,ইফাঃ ৬১৩৫) এই সাহাবী রসূল (সঃ) দাওয়াত পাওয়ার পূর্বেই সলাত আদায় করতো। এই বিষয়গুলো আরবে তখনও আগেরমতই জানা ছিলো। যেমনটা বললাম পূর্বের নবিরাও একই দ্বীন পালন করতেন। সলাত (নামাজ) এর ব্যপারে বহু আয়াত আছে আপনার কুরআন খুললেই দেখতে পাবেন যে পূর্বের নবীরাও সলাত আদায় করতেন। এমনকি তাওরাত ও ইঞ্জিনেও সলাতের ঐ অংশগুলো একদম পরিস্কার বলা আছে যে তখনও এইভাবেই পাঁচবার তিন ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হত। যেমনটা এখন শিয়া মুসলিমরা আদায় করে থাকে। তারা পাঁচবার নামাযকে দিনে তিনটি ওয়াক্তে আদায় করে। নামাজের ব্যপারে দলিল সহ পরবর্তীতে পোস্ট করবো ইন-শা-আল্লাহ্‌।যাকাতের ব্যপারেও নামাজের মতই মানুষ আগে থেকেই অবগত ছিলো। পূর্বের নবীদের সময়েও যাকাত প্রদান করা হত। যখনি আল্লাহ্‌ যাকাত দিতে বলতেন, এটা তাদের জন্য অপরিচিত ইবাদাত ছিলো না। ইব্রাহীম (আঃ) থেকেই লোকেরা যাকাতের ব্যপারে ভাল ভাবেই জানতো। এ কারনেই আল্লাহ্‌ বলেন- ‘’আর যাদের সম্পদের নির্ধারিত হক রয়েছে।’’ (মা'আরিজ ৭০/২৪)। পূর্বের নবীদের থেকেই যাকাত চলে এসেছে এবং যেখানে সংস্কারের প্রয়োজন হত সেখানে নবীদের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তা করে দিতেন। যেমন আল্লাহ্‌ নবী ইসমাইল (আঃ) সম্পর্কে বলেন-‘’সে তার পরিবারবর্গকে নামায ও যাকাতের হুকুম দিত আর সে ছিল তার প্রতিপালকের নিকট সন্তুষ্টির পাত্র।’’ (মারইয়াম ১৯/৫৫)। আল্লাহ্‌ বনী ইসরাইলকে বলেছেন - ‘’আল্লাহ বলেছিলেন, নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি, যদি তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও।’’ ( মায়েদা ৫/১২)। এছাড়াও যাকাতের ব্যপারে বহু আয়াত আছে আমি সেগুলার রেফারেন্স দিয়ে নোট বড় করলাম না।


সুন্নাত কি হাদিস ও সুন্নাতের পার্থক্য কি? (পর্ব ১)


হজ্জ ও ওমরার ব্যপারে তো সাধারণত সবাই জানে যে জেভাবে আমরা এখন হজ্জ করি রাসুল সঃ এর আগে আরবরা এভাবেই ওমরা ও হাজ্জ করতো। ইবরাহিম আঃ এর সময় থেকেই হজ্জ চলে এসেছে। কুরআন মাজিদে আল্লাহ্‌ এই ব্যপারে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। এবং হাদিসেও পাওয়া যায় যে মুহাম্মাদ সঃ হজ্জ করার সময় সেই বিদাত (দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু যোগ করা) করতেন না যেগুলা আরবরা করতো। বুখারিতে রসূল সঃ এর এক সাহাবী এই ঘটনা বর্ণনা করেন যে রসূল সঃ এর দাওয়াতের পূর্বেই আমি হজ্জ এর জন্য মুজদালিফায় ছিলাম কারন আমার উট হারিয়ে গিয়েছিলো। আমি উট খুঁজতে খুঁজতে আরাফায় চলে গিয়েছিলাম। কুরাইশরা এই বিদাত (দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু যোগ করা) চালু করেছিলো যে সাধারন লোক তো আরাফায় যাবে হজ্জের সময় কিন্তু আমরা আরাফা পর্যন্ত যাবো না কারন আমরা মসজিদে হারামের দেখাশুনার দায়িত্বে আছি, তাই আমরা হারামের বাইরে যেতে পারবো না। তাই তারা মুজদালিফা পর্যন্তই থাকতো। ঐ সাহাবী বললেন আমি দেখলাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ আরাফায় অবস্থান করছে। তখন আমি চিন্তা করলাম কুরাইশরা তো আরাফা পর্যন্ত আসেনা তাহলে সে কেন এখানে ? পরবর্তীতে রাসুল (সঃ) নবুয়তের দাওয়াত দেন এবং এই সাহাবী ঈমান আনে। তারপর কুরআন মাজিদে এই আয়াত নাজিল হয় যে সবার জন্যই হজ্জের সময় আরাফায় যাওয়া বাধ্যতামূলক। মুজদালিফায় থাকার বিদাত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। খেয়াল করলে দেখবেন যে এইসকল ইবাদাতের ব্যপার আগে থেকেই মানুষের মাঝে কতটা স্পষ্ট ছিলো আগে থেকেই। সিয়াম বা রোজার ব্যপারে তো আল্লাহ্‌ আয়াতেই বলে দিয়েছেন যে পূর্বের লোকেরাও তোমাদের মতই রোজা রাখতো - ‘’হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। ‘’(বাকারা ২/১৮৩) এইকারনেই যেইসকল বিষয়ে মানুষ কোন পরিবর্তন করেনি আর ঠিকমত মেনে চলেছিলো সেগুলার ব্যপারে আল্লাহ্‌ কুরআন মাজিদে নতুন করে কিছু বলেনি। আর যেইসকল বিষয়ে মানুষ বিদআত চালু করেছে বা আমল বন্ধ হয়ে গিয়েছে বা কোন ভুল করতেছে সেগুলার ব্যপারে আল্লাহ্‌ আয়াত নাজিল করে শুধু ঐ অংশ শুধরে দিয়েছেন। নামাজে কোন ভুল হলে সেটা আল্লাহ্‌ শুধরে দিয়েছেন, অজু’তে ভুল হলে সেটা শুধরে দিয়েছেন, হজ্জ ও ওমরায় যেই ভুল হয়েছে সেগুলা শুধরে দিয়েছেন। যখন মানুষ শুরু থেকে বিস্তারিত না জানতে পারে তখন সাধারন মানুষ যখন কুরআন পাঠ করে তখন তারা ভাবে নামাজ ও যাকাত এত গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদাত কিন্তু এগুলা আদায়ের নিয়মকানুন বিস্তারিতভাবে কুরআন মাজিদে নেই কেন ? এর কারন হচ্ছে কুরআন মাজিদে নামাজ ও যাকাতের নিয়মকানুন বিস্তারিতভাবে দেওয়ার কোন প্রয়োজনই নেই কারন মানুষ এই ব্যপারে আগে থেকেই জানতো। উধাহরন হিসেবে বলি, এখন যদি আল্লাহ্‌ কোন কিতাব নাজিল করতেন তাহলে নামাজের বা যাকাতের যদি কোন অংশে ভুল হয় বা বিদআত চালু হয় তাহলে সেটা শুধরে দিবেন, কিন্তু পুনরায় নামাজ বা যাকাত আদায়ের নিয়ম বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন হবেনা কারনে মানুষ এই ব্যপারে ভালভাবেই জানে। এখন যেমন আমরা নামাজ ও যাকাত এবং বাকি ইবাদাতের ব্যপারে জানি ঠিক তেমনি পূর্বেও লোকেরা এই ব্যপারে জানতো।
  • প্রথম বিষয়ঃ দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়ে নবী রসূলগন কোন পরিবর্তন করতে আসেনা। বরং দ্বীনের ব্যপারে উনারা মানুষকে হেদায়েত দিতে আসেন। সাধারন সকল মানুষ সুন্নাতের ব্যপারে যেমন আমভাবে বলে এগুলা আসলে সুন্নাত না । সুন্নাতের জন্য অবশ্যই অবশ্যই সেটা দ্বীনের কোন বিষয় হতে হবে। যেমন আমরা জানি রসূল (সঃ)এর সময়ে তিনি যুদ্ধের সময়ে অস্ত্র হিসেবে তীর,বল্লম,তলোয়ার ব্যবহার করেছেন, যানবাহন হিসেবে উট ও ঘোড়া ব্যবহার করেছেন, মসজিদের ছাদ খেজুরের ডাল বিছিয়ে তৈরি করেছেন, এবং সেই ফলমূল ও খাবার খেয়েছেন যেগুলো আরব সমাজে প্রচলিত ছিলো এবং সেখান থেকে তিনি নিজের পছন্দের জিনিস খেয়েছেন নইলে বাদ দিয়েছেন। তিনি আরব সমাজের প্রচলিত নিয়মের পোশাক পড়েছেন যেমন লুঙ্গি,চাদর,পাগড়ি,টুপি,হাতের লাঠি ইত্যাদি,এক্ষেত্রেও তিনি নিজের পছন্দমত পোশাক পড়তেন যেমনটা আমরাও পছন্দমত পোশাক পরি। যাইহোক, এইসকল কোন কিছুই সুন্নাহ হিসেবে বলাই যাবে না। সুন্নাহ বলতে হলে অবশ্যই সেটা দ্বীনই কোন বিষয় হতে হবে বা ঐ বিষয়কে দ্বীন প্রমান করতে হবে। যেমন - ‘’ তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে একটি খেজুর বাগান অতিক্রম করছিলাম। তিনি লোকেদেরকে দেখলেন যে, তারা নর খেজুর গাছের কেশর মাদী খেজুর গাছের কেশরের সাথে সংযোজন করছে। তিনি লোকেদের জিজ্ঞাসা করলেনঃ এরা কী করছে ? তালহা (রাঃ) বলেন, তারা নর গাছের কেশর নিয়ে মাদী গাছের কেশরের সাথে সংযোজন করছে। তিনি বলেনঃ এটা কোন উপকারে আসবে বলে মনে হয় না। লোকজন তাঁর মন্তব্য অবহিত হয়ে উক্ত প্রক্রিয়া ত্যাগ করলো। ফলে খেজুরের উৎপদান কমে গেলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি জানার পর বলেনঃ এটা তো ছিল একটা ধারণা মাত্র। ঐ প্রক্রিয়ায় কোন উপকার হলে তোমরা তা করো। আমি (দুনিয়ার বিষয়ে) তোমাদের মতই একজন মানুষ। ধারণা কখনো ভুলও হয়, কখনো ঠিকও হয়। কিন্তু আমি তোমাদের এভাবে যা বলি ‘‘আল্লাহ বলেছেন’’, সেক্ষেত্রে আমি কখনো আল্লাহ্র উপর মিথ্যা আরোপ করবো না।’’( ইবনে মাজাহ ২৪৭০) । এই ব্যপারে আরো হাদিস আছে আমি সেগুলা পেশ করে নোট বড় করতে চাইনা। মূল কথা হচ্ছে কোন বিষয়কে সুন্নাত প্রমান করতে হলে আগে প্রমান করতে হবে সেটা দ্বীনের কোন বিষয় কিনা ? অনেকে এই আয়াত দিয়ে মানুষকে বলে থাকে যে আল্লাহ্‌ বলেছেন- ‘রসূল যা দেয় তোমরা গ্রহন করো আর যা থেকে নিষেধ করে বিরত থাকো।’ কিন্তু তাদেরকে এইটাও মনে করিয়ে দেই আল্লাহ্‌র রসূল (সঃ) কে আল্লাহ্‌ নতুন কোন দ্বীন দেয়নি যেমনটা উপরে বললাম। আল্লাহ্‌ বলেন - ‘’অতঃপর তোমার প্রতি ওয়াহী করছি যে, তুমি একনিষ্ঠ ইবরাহীমের মতাদর্শ অনুসরণ কর।’’( নাহাল ১৬/১২৩)। এবং রাসুল (সঃ) নিজেই হাদিসে বলেছেন দ্বীন এর ব্যপারে আমি যা দেই তা মেনে চলো দুনিয়ার ব্যপারে আমি তোমাদের মতই মানুষ এবং তোমরা এই ব্যপারে ভাল বুঝো। তাই কোন একটি হাদিস তুলে ধরে কেউ সুন্নাত প্রমান করতে চাইলে আগে বুঝাতে হবে সেটা দ্বীন কিনা বা রসূল (সঃ) সেটা দ্বীন হিসেবে দিয়েছেন কিনা ? তানাহলে সেটা সুন্নাত নয়।
  • দ্বিতীয় বিষয়ঃ সুন্নাত শব্দটা বলা হবে আমাদের আমলের কোন বিষয়ের ক্ষেত্রে। ঈমান ও আকিদার ক্ষেত্রে সুন্নাত ব্যবহার করা যাবে না। উধাহরন হিসেবে নামাজ পড়া, রোজা রাখা, খতনা করা, বিয়ে করা এই ধরনের আমলের ক্ষেত্রে সুন্নাত বলা হবে। এইটা বলা যাবেনা যে আল্লাহকে মানা সুন্নাত, অথবা ফেরেশতাদের উপর ঈমান আনা সুন্নাত। এগুলা সবই ঈমান আকিদার বিষয়। সুন্নাত বলা হবে জীবনের আমলের যেসকল বিষয় আছে সেগুলার ক্ষেত্রে।
  • তৃতীয় যেই বিষয়টি মনে রাখতে হবেঃ এমন অনেক বিষয় আছে যেগুলো সুন্নাতের মাধ্যমে মুসলমানদের ইজমার (ঐকমত) মাদ্ধমেও প্রমানিত আবার কুরআনেও আছে। এক্ষেত্রে যখন কোন বিষয় কুরআন মাজিদেও আছে আবার সুন্নাতেও প্রমানিত, তখন আমরা এটাকে কুরআন বলবো নাকি সুন্নাত বলবো ? উধাহরন হিসেবে যেমন আগেই বললাম যে নামাজ পূর্বে থেকেই নবী রাসুলের মাধ্যমে সুন্নাত ও উম্মতের ঐক্যমতের মাধ্যমে চলে এসেছে। আবার হজ্জের ক্ষেত্রেও সেটা পূর্বের থেকেই চলে এসেছে আর কুরআনেও এই ব্যপারে আদেশ দেওয়া হয়েছে। তাহলে এই বিষয়গুলাকে আমরা কুরআন বলবো নাকি সুন্নাত বলবো ? এই ব্যপারে ওলামাগণ খুব সুন্দর কিছু উসুল (শর্ত) তৈরি করেছেন যে, যদি কোন বিষয় পূর্বের নবী রসূলদের সুন্নাতের মাধ্যমেই আগে থেকেই চলে আসে কিন্তু তারপরে আল্লাহ্‌ কুরআন মাজিদে পুনরায় ঐ বিষয়ে তুলে ধরেন তাহলে সেটাকে সুন্নাত’ই বলা হবে। কারন সেটা কুরআনের আগেই পূর্বে থেকেই নবী রাসুলের মাধ্যমে চলে এসেছে। কিন্তু যদি কোন বিষয় কুরআন মাজিদে আগে হুকুম আসে আর রাসুল সঃ পরবর্তীতে সেটার উপর আমল করেন তাহলে সেটা কে কুরআনের হুকুম বলা হবে সুন্নাত বলা হবে না। কারন সেটা আগে কুরআন মাজিদে এসেছে তারপর নবী সঃ সেই হুকুমের উপর আমল করেছেন। উধাহরন হিসেবে বলি, যেমন আগেই বললাম নামাজ , যাকাত, রোজা, হজ্জ আগে থেকেই চলে এসেছে ... এই কারনে এগুলাকে সুন্নাত বলা হবে যদিও কুরআন মাজিদে এই ব্যপারে আছে। আরেকটা উধারহন দেই যেমন, আল্লাহ্‌ পাঁচটি জুলুমের বা অন্যায়ের শাস্তি দেওয়ার ব্যপারে কুরআন মাজিদে আদেশ করেছেন। যদি কোথাও মুসলমানদের শাসন ব্যবস্তা কায়েম হয় তাহলে অপরাধীকে এই পাঁচটি বিষয়ে শাস্তি দিবে মুসলিম শাসক। আর রসূল (সঃ) এই আয়াতের উপর আমল করেছেন। উনার সময়ে উনি এই অন্যায়ের শাস্তি দিয়েছেন। এই কারনে রাসুল (সঃ) এর আমলের কারনে সেটা সুন্নাত হিসেবেও প্রমানিত আবার কুরআন মাজিদেও আছে। কিন্তু যেহেতু কুরআন মাজিদে এই শাস্তির আদেশ আগে এসেছে এবং রাসুল সঃ এই আয়াতের উপর আমল করেছেন তাই এটাকে সুন্নাত বলা হবেনা বরং কুরআন বলা হবে।
  • চতুর্থ বিষয় হচ্ছেঃ উধাহরন হিসেবে কোন বিষয় রাসুল সঃ এর সুন্নাতের মাধ্যমে প্রমানিত। যেমন নামাজ পড়া। এটা আমরা জানি যে দিনে পাঁচবার নামাজের পাশাপাশি জুমআ’র একটি নামাজ আছে, জানাজার একটি নামাজ আছে, ঈদেরও একটি নামায আছে। সাথে এটাও আমরা জানি যে এই পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পাশাপাশি কোন ব্যক্তি যদি অতিরিক্ত কোন নফল নামাজ পড়তে চায় সেটাও পড়তে পারে। রসূল সঃ যখন মানুষকে এই নফল ইবাদাত করতে বলবেন তখন নিজেও তো সেইটা পড়বেন তাইনা ? তো কোন নফল ইবাদাত (সেটাই সুন্নাত) বার বার যদি রসূল সঃ নফল হিসেবে পড়ে তাহলে সেটা বার বার পড়ার কারনে নতুন করে বার বার সুন্নাত হবে না। যেমন উধাহরন রসূল সঃ যদি উনার জীবদ্দশায় দুইবার হজ্জ করে তাহলে আমরা এইটা বলবো না যে দুইবার হজ্জ করা সুন্নাত। হজ্জ করার হুকুম তো রসূল সঃ দিয়েই দিয়েছেন সুন্নাত হিসেবে। এরপর আপনি দশবার হজ্জ করলেও আপনার ফরজ আদায় হয়ে গিয়েছে বাকিগুলা নফল হিসেবেই আদায় হবে। বার বার করার কারনে সেটা বার বার নতুন সুন্নাত হবে না।
  • পঞ্চম বিষয়ঃ যেটা মাথায় রাখতে হবে যেটা সাধারনভাবেই আলেমগন জানেন। কিছু জিনিস মানুষের ভিতর স্বভাবগতভাবেই দেওয়া হয়েছে। যেমন, সত্য বলা ভাল, মিথ্যা বলা খারাপ। লেনদেন ভাল রাখা ভাল, কিন্তু ঋণখেলাপি খারাপ কাজ। চুরি করা বা অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা খারাপ কাজ। এগুলা সবই মানুষ স্বভাবগতভাবেই জানে । স্বাভাবিকভাবে এই বিষয়গুলো রসূল (সঃ) ও বলেছেন , আল্লাহও কুরআন মাজিদে এইসকল ব্যপারে বলেছেন। কিন্তু যেহেতু এগুলা আল্লাহ্‌ই মানুষের ভিতর স্বভাবগতভাবেই দিয়ে দিয়েছেন তাই এইসকল বিষয়কে কুরআন বা সুন্নাত হিসেবে ধরা হবে না। বরং এগুলা আল্লাহ্‌ই পূর্বে থেকে মানুষের ভিতরে স্বভাবগত ভাবেই দিয়েছেন। যেমন খৃষ্টান, হিন্দু, ইহুদি সবাই এইটা মানে যে সত্য বলা ভাল, মিথ্যা বলা খারাপ, চুরি করা খারাপ ইত্যাদি ইত্যাদি ... । তাই এগুলাকে কুরআন বা সুন্নাত হিসেবে পেশ করা যাবে না।
  • ষষ্ঠ বিষয়ঃ রসূল (সঃ) অনেক সময় কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে আদেশ করতেন ঠিকই কিন্তু সেটা দ্বীন হিসেবে বলা উদ্দেশ্য থাকতো না। উধাহরন হিসেবে, আমরা নামাজের ভিতর সূরা ফাতিহা পড়ি এবং সাথে কয়েকটা আয়াত বা সূরা মিলাই এটা রাসুল (সঃ) সুন্নাত হিসেবে দিয়েছেন। এগুলো বাদে নামাজ হবেই না। এটা প্রত্যেক নামাজে বাধ্যতামূলক যে সূরা ফাতেহা ও কিছু আয়াত মিলাবে। একদিন এক ব্যক্তি রসূল (সঃ) এর নামাজ ভালোভাবে খেয়াল করে দেখলেন এবং রসূল (সঃ) কে জিজ্ঞাস করলেন আপনি সূরা ফাতিহা পড়ার পূর্বে কিছু সময় চুপ করে ছিলেন। তখন আপনি কি পড়েছেন ? তখন রসূল (সঃ) বললেন আমি তখন এই দুআ পড়েছি। আবার আরেকদিন অন্য ব্যক্তি জিজ্ঞাস করাতে রসূল (সঃ) আরেকটি দুআ পড়েছেন বলেছেন। আবার ভিন্ন আরেকদিন আরেক ব্যক্তির জবাবে তিনি তৃতীয় আরেকটি দুআ’র কথা বলেছেন। এমন বহু হাদিস পাবেন নামাজের ক্ষেত্রে এবং অন্যসকল ক্ষেত্রে যেখানে রসূল (সঃ) দ্বীন হিসেবে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিলো না। শুধু জিজ্ঞাসার উত্তরে তিনি বলেছেন। এইসকল আমল থেকে এটাই প্রমানিত হয় যে রসূল (সঃ) এই দুআগুলা আমভাবে সুন্নাত হিসেবে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিলো না। এইসকল বিষয়কেও সুন্নাত হিসেবে বলা যাবেনা বরং আমাদের নবী (সঃ) এর অতিরিক্ত আমল হিসেবে ধরা হবে।
যখন এই সবগুলা বিষয় জানা থাকবে এবং তারপর যদি প্রশ্ন করা হয় এই সকল উসুল (শর্ত) মেনে কি বলা যাবে যে সুন্নাত তাহলে কি কি ? যেমন কুরআনের ব্যপারে কেউ জিজ্ঞাস করলে আপনি কুরআন হাতে ধরিয়ে দিবেন তাইনা ? তেমনি সুন্নাতগুলা কি বলা যাবে ? জী অবশ্যই বলা যাবে ! আমি আপনাদের সামনে সুনান বা সুন্নাতের যতগুলা বিষয় পূর্বের নবী রসূল থেকে নিয়ে রসূল সঃ পর্যন্ত চলে এসেছে এবং রসূল সঃ ও কুরআন সেই বিষয়গুলা সেভাবেই রেখেছে সেগুলা তুলে ধরছি। এগুলাতে কোন বিদআত বা কোন সংস্কার দরকার হলে আল্লাহ্‌ ও আল্লাহ্‌র রসূল (সঃ) ঠিক করে দিয়েছেন। এই সুন্নাতগুলার ব্যপারে আপনাদের চিন্তার প্রয়োজন নেই কারন এগুলা সবই প্রমানিত সুন্নাত। কিছুই উম্মতের অজানা নয়। আর এগুলা সবই পূর্বে থেকেই চলে এসেছে যেমনটা উপরে বলেছি !
প্রথম বিষয় ১) সলাত বা নামাজ। নামাজের ব্যপারে সুন্নাত নিয়ে বিস্তারিত লিখলাম না, কারন লিখা বড় হয়ে যাবে। পুরো নামাজের নিয়ম বিস্তারিতভাবে পরবর্তীতে শেয়ার করবো ইন শা আল্লাহ্‌।
২) যাকাত ও সাদাকাতুল ফিতর। রামাদান মাস শেষ হবার পর আমাদের প্রত্যেকের পক্ষ থেকে একজন গরিব মিসকিনকে আড়াই কেজির পরিমান খাবার দিতে হবে।

৩) রোজা ও এহতেকাফ । ৪) হজ্জ ও ওমরা। ৫) কুরবানি ও কুরবানির দিন (আইয়ামে তাশরিক) তাকবিরে নামাজ। এই পাঁচটি ইবাদাত সুন্নাত হিসেবে পূর্বের নবীরা এবং শেষ নবী মুহাম্মাদ (সঃ) একইরকম রেখে উম্মতের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

দ্বিতীয় বিষয় সামাজিকতার সাথে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে দুইটি বিষয় পূর্বের থেকে একই রকমভাবেই চলে এসেছে। একটি হচ্ছে পুরুষ নারীর শারীরিক সম্পর্ক বিয়ের মাধ্যমে স্বামী স্ত্রীর মদ্ধেই সিমাবদ্ধ থাকবে। আর বিয়ে ছাড়া পুরুষ নারীর শারীরিক মেলামেশা নিষেধ বা হারাম ছিলো পূর্বে থেকেই। প্রত্যেক নবী রসূলদের সময়েই বিয়ের ব্যপারটা একই রকম ছিলো। বিয়ে কিভাবে হবে আর বিয়ের নিয়মকানুন কি হবে এটাও সুন্নাত হিসেবে পূর্বে থেকেই একইরকম ছিলো যেমনটা এখনও আছে। রসূল (সঃ) এর পূর্ব থেকেই এইভাবেই মোহর আদায় করা হত , এভাবেই বিয়ের খুৎবা দেওয়া হত। রসূল (সঃ) যখন খাদিজা (রাযিঃ) কে বিয়ে করে, তখন তিনি নবী হিসেবে নবুয়্যত পায়নি তখন রসূল (সঃ) এর চাচা উনার বিয়ের খুৎবা দিয়েছিলেন। ‘’সিরাতে ইবনে হিসাম’’ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করা হয়েছে। কুরআন এর আয়াত বাদে কমবেশি একইরকম খুৎবা ছিলো আগেও। তেমনি তালাকের ব্যপারেও পূর্ব থেকেই একইরকম নিয়ম ছিলো। তবে যেখানে কোন ভুল হয়েছিলো আল্লাহ্‌ সেটা শুধরে দিয়েছেন কুরআন মাজিদের মাধ্যমে। এছাড়া সব নিয়ম একই রকম ছিলো পূর্বে থেকেই।

এরপরের বিষয় হচ্ছে খানাপিনার ব্যপারে। আমাদের দ্বীন ইসলামে যেমন আখলাক বা চরিত্র পাক পবিত্র রাখার ব্যপারে আদেশ করা হয়েছে, শরীরের পাক পবিত্রের ব্যপারে আদেশ করা হয়েছে তেমনি খাওয়াদাওয়ার ব্যপারেও পবিত্র বস্তু খেতে বলা হয়েছে আর অপবিত্র বস্তু খেতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন শূয়র, মৃত প্রাণী , রক্ত, মদ ইত্যাদি ... ইত্যাদি । এর মধ্যে তো কিছু জিনিস স্বভাবগত কারনেই অনেকে খায় না। পবিত্র খাবারগুলো আল্লাহ্‌ নবী রসুলের মাধ্যমে হালাল করে দিয়েছে এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করে দিয়েছেন। যেগুলো সুন্নাত হিসেবে চলে এসেছে।

আদব ও শ্রিস্টাচার প্রথা নবী রসূলদের মাধ্যমে ১৮ টি সামাজিক আদব ও শ্রিস্টাচারের বিষয় দ্বীন হিসেবে নবী রসূলগণ পূর্বে থেকেই প্রচার করে দিয়েছেন।
১) যখন আমরা খাওয়াদাওয়া করবো তখন নবীগণ এই সুন্নাত দিয়েছেন যে আমরা আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে (বিসমিল্লাহ) বলে খাবার শুরু করবো এবং ডান হাতে খাবো। কারন খাবার আল্লাহ্‌র একটি বড় নেয়ামত তাই আল্লাহ্‌র নাম নিয়েই খাওয়া উচিৎ। ডান হাতের কথা বলা হয়েছে এর কারন এটা হতে পারে যে, নবী রসূলদের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ এই খবর দিয়েছে যে, কেয়ামতের দিন নেককার বান্দাদের আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে। যাতে আমরা সবসময় এইটা স্মরণ রাখি যে আমাদের এমন কাজ করা উচিৎ যাতে কিয়ামতের দিন আমাদের আমলনামা ডানহাতে দেওয়া হয়। এই বিষয়টা স্মরণ থাকার জন্য ডান হাতকে বেশি গুরুত্ত দেওয়া হয়েছে।
২) একে অপরের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করার সময় একেক জাতি বা ধর্ম একেক রকমের অভ্যর্থনা জানায়। যেমন- আদাব, নমস্কার, হায়, হ্যালো, গুডমর্নিং ইত্যাদি । নবী রসূলদের সুন্নাতে ‘’আসসালামু আলাইকুম’’ বলার নিয়ম সুন্নাত হিসেবে দেওয়া হয়েছিলো। যেমন আপনারা যারা কুরআন পড়েছেন তারা জানেন ইব্রাহীম (আঃ) এর নিকট যখন ফেরেশতা আসতো তখন সালাম দিয়ে কথা শুরু করতেন ( সূরা হূদ ১১/৬৯, আল-হিজর 15/52)।
৩) আল্লাহ্‌র শুকরগুজার সবসময় খেয়াল থাকার জন্য এটাও সুন্নাত হিসেবে নবী রসূলদের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে যে হাঁচি দিলে ‘’আলহামদুলিল্লাহ’’ (প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য) বলবে। পূর্বের নবীদের সময় থেকেই এটা প্রচলিত ছিলো। আরবে রসূল সঃ এর পূর্বেও লোকেরা এর ব্যপারে জানতো এবং আরবরা এর নাম দিয়েছিলো তাশমিদ (তাশমিতুল আতেছ)।
৪) বাচ্চা জন্ম নিলে বাচ্চার কানে আজান ও একামাত দিতে হয়। এটা আজান ও একামাত প্রচলন শুরুর পর রসূল সঃ সুন্নাত হিসেবে দিয়েছেন। আগেই বলেছি কিছু জিনিস নবী রসূলদের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ শুধরে দিয়েছেন। আজানের ও একামাতের শব্দগুলোর অর্থ খেয়াল করলে দেখবেন পুরো দ্বীনের দাওয়াত এর ভিতরেই আছে।
৫) শরীরের পাক পবিত্রতার জন্য কিছু আদব দেওয়া হয়েছে । যেমন, গোঁফ ছোট করা। মুছ বা গোঁফ বড় বড় রাখলে এতে অহংকার তৈরি হতে পারে, আর আমাদের দ্বীন ইসলামে অহংকার ও দাম্ভিকতা হারাম করা হয়েছে। অহংকার এক ভয়ানক রোগ। তাই নবী রসূলগণ অন্তরের অহংকারের পাশাপাশি বাহ্যিক যেইসব দিক দিয়ে পোশাক ও শারীরিক চালচলনে অহংকার তৈরি হতে পারে সেখানে শুধরে দিয়েছেন সুন্নাতের মাধ্যমে। তাই গোঁফ ছোট করে ছেটে রাখার কথা বলা হয়েছে। এমন নয় যে একদম চেছে ফেলে দিতে হবে। বরং ছোট করে রাখলেই হবে।
৬-৭) বগল ও লজ্জাস্থানের পশম পরিস্কার করা। এটাও শরীরের পবিত্রতার জন্যই সুন্নাত হিসেবে নবী রসূলগণ দিয়েছেন পূর্বে থেকেই।
৮) নখ কেটে ছোট রাখা। এটাও পাকপবিত্রের জন্যই সুন্নাত হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
৯-১০-১১) নাক, মুখ, ও দাত পরিস্কার রাখা। এগুলা সবই পূর্বের নবীদের থেকেই চলে এসেছে। এগুলা সবই শরীরের পাক-পবিত্রতার বিষয়।
১২) নারীদের পিরিয়ডের সময় শেষ হলে তারা গোসল করে পবিত্র হবে। এটাও সুন্নাত এবং পাক পবিত্রতার বিষয়।
১৩) স্বামী-স্ত্রী মিলনের পর দুজনেই গোসল করবে।
১৪) মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়াও সুন্নাত হিসেবে প্রচলিত পূর্বে থেকে।
১৫) মৃত ব্যক্তিকে কবর দেওয়ার পূর্বে কাফন পড়ান।
১৬) তারপর মৃত ব্যক্তিকে আল্লাহ্‌র জমিনে দাফন করবো। আগুনে পোড়ানো বা অন্য কোন নিয়ম নয়। আর এই ব্যপারে আল্লাহ্‌ আদম আঃ এর সন্তান হাবিল ও কাবিলের মৃত্যু ও দাফনের ব্যপারে কুরআন মাজিদে বলেছেন।
১৭-১৮) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এর ধর্মীয় উৎসব। এই সুন্নাত রসূল সঃ এর মাধ্যমে শুরু হয়েছিলো। এমন নয় যে এর আগে এমন ধর্মীয় ঈদ বা উৎসব ছিলো না, বরং ইহুদিদের মধ্যে সাতটি উৎসব পালন করা হত আর রসূল সঃ এটাকে দুইটির মধ্যে সিমাবদ্ধ করে দিয়েছেন বাকিগুলা বাদ দিয়েছেন। বাকি উৎসবগুলো তাদের সাথেই খাস ছিলো তাই সেগুলা বাদ দেওয়া হয়েছে।

উপরে সুন্নাতগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এগুলাই সুন্নাত। আর এগুলা ছাড়া আর কোন সুন্নাত প্রমানিত নেই। উপরের উসুল (শর্ত) মোতাবেক এই সুন্নাতগুলো আপনাদের সামনে পেশ করে দিলাম। এই সুন্নাতগুলাতে আর কুরআন এর মাঝে কোন এখতেলাফ বা বিরোধ নেই। এগুলার মধ্যে যেই বিষয়গুলো কুরআন মাজিদে আল্লাহ্‌ বলেনি সেটা এই কারনে বলেনি যে সেটার ব্যপারে উম্মত জানে। আর কিছু ব্যপারে উম্মত বিদআত করেছে বা সুন্নাত বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেক্ষেত্রে আল্লাহ্‌ আয়াতের মাধ্যমে মূল বিষয়টা শুধু তুলে ধরেছেন এবং পুনরায় চালু করে দিয়েছেন নবী (সঃ) এর মাধ্যমে। এই কারনে আমভাবে আল্লাহ্‌ বলে দিয়েছেন ইব্রাহীমের দ্বীনের অনুসরন । সুন্নাতের ব্যপারে তো আমরা জেনে ফেললাম , তাহলে হাদিস কি ? হাদিসের ব্যপারে জানতে এখানে ক্লিক করে পরবর্তী নোট পড়ুন।

কিছু কথাঃ আমি জানি সমাজের বেশিরভাগ হুজুরের বলা সুন্নাতের সাথে এই নোটের হয়তো মিল হবেনা অনেক বিষয়েই। কারন সমাজে আমভাবে সবকিছুকে কোন প্রমান ছাড়াই সুন্নাত বলে থাকে। আমি এই নোট পেশ করার উদ্দেশ্য যাতে আপনারা একটু পড়াশুনা করার সুযোগ পান আর চিন্তার খোঁড়াক পান। দ্বীনের ব্যপারে সবাই একমত হয়ে যাবে এটা কোনদিন কেয়ামত পর্যন্ত হবে না। তাই দয়া করে নোটটি শুধুমাত্র জানার জন্য পড়ুন। যারা খোলামনে দ্বীন শিখার আগ্রহি তারা সত্য খুজে পাবেন ইন শা আল্লাহ্‌। নোটের কোন আয়াত বা হাদিসে ও লিখাতে ভূল থাকলে কমেন্টে শুধরে দিন। কিন্তু প্রমান ছাড়া কোন কথা লিখলে বা ঝগড়া করলে কমেন্ট ডিলিট করে দিবো। আর কোন আলোচনা থাকলে কমেন্টে বাংলাতে সুন্দরভাবে পেশ করুন যাতে সবাই আপনার কথা পরিস্কার বুঝতে পারে। কোন লিঙ্ক, ভিডিও, লেকচার দিবেন না কারন এগুলো আমি আগেই পড়েছি হাদিস ও সুন্নাতের ব্যপারে। স্পেসিফিক কিছু বলার থাকলে বলবেন দলিল প্রমান সহ। জাযাক আল্লাহ্‌ খায়ের (আল্লাহ্‌ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দান করুন)।
আসসালামু আলাইকুম ...
আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!

Post a Comment

0 Comments