হাদিস কি হাদিস ও সুন্নাতের পার্থক্য কি? (পর্ব ২ শেষ পর্ব)

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে শুরু করছি

পর্ব ১ | পর্ব ২ শেষ পর্ব |

এখন প্রশ্ন হচ্ছে হাদিস কি ? আমাদের সমাজে সুন্নাতকে যেভাবে আমভাবে বলা হয়ে থাকে এতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেনা সুন্নাত আর হাদিসের মধ্যে কি পার্থক্য ? পূর্বের নোটে প্রমান করেছি যে সুন্নাত হচ্ছে পূর্বের নবী রসূলদের তরিকা বা নিয়মনীতি। যা উম্মতের ইজমা বা ঐকমত ও দাওয়াতের মাধ্যমে এক উম্মত থেকে আরেক উম্মতের মাঝে পূর্বে থেকেই চলে এসেছে যেভাবে আমরা কুরআন পেয়েছি । কুরআন রসূল (সঃ) এর পর থেকে পেতে যেমন হাদিসের কোন প্রয়োজন হয়নি ঠিক সুন্নাতগুলো জানতে বুখারি বা মুসলিম কোন কিতাব দেখার প্রয়োজন নেই। আমরা কুরআন যেভাবে একদম বিশুদ্ধভাবে উম্মতের ঐকমত ও প্রচারের মাধ্যমে পেয়েছি, ঠিক সুন্নাতও একইভাবে পেয়েছি। এতে কোন পার্থক্য নেই। সুন্নাতের ব্যপারে মুসলিমদের মধ্যে বিন্দুমাত্র মতানৈক্য নেই।




এবার হাদিসের ব্যপারে বলি। রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবুয়্যতের পর থেকে তিনি কমবেশি ২৩ বছরের মত পৃথিবীতে ছিলেন। এটা আমরা সবাই জানি কোন স্বনামধন্য সম্মানি ব্যক্তি হলে অনেকেই তার চলাফেরা , কথাবার্তা, বক্তব্য সবকিছুই সংরক্ষন করার চেষ্টা করে আর এটাই স্বাভাবিক। রসূল (সঃ) যখন কোন কথা বলতেন বা কাজ করতেন সেটা সাহাবীদের মাঝেই হোক, যুদ্ধের ময়দানে হোক, দ্বীনের কোন ব্যপারে হোক, কোন ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময়ে হোক, নাহয় কোন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে হোক, অথবা কোন ক্ষেত্রে তিনি কোন আমল করার সময়ে বা উনার সামনে কেউ কোন কর্মকাণ্ড করলে সেটার জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রেই হোক,অথবা উনার সামনে কোন কথাবার্তা বা কাজ হলে উনি নিরব থাকলে সেই ব্যপারেই হোক , উনার পুরো জীবনীর অথবা কোন সম্মানি ব্যক্তির জীবনীতে এই তিনটি জিনিসই হওয়া স্বাভাবিক। তা হচ্ছে তার কল (কথা), ফেল (কর্ম বা কাজ), তাকরির (সমর্থন) । আর রসূল (সঃ) এর ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়েছে। মানুষ ভালোবেসে রসূল (সঃ) এর এই কথা,কর্ম,সমর্থন একজন আরেকজনের কাছে বলতো। আর এইটা স্বাভাবিক যে সম্মানি বড় মানুষ পৃথিবী থেকে চলে গেলে তার কথা কাজ চলাফেরা সবকিছুই মানুষ প্রচার করে একে অপরের কাছে এবং লিখেও রাখে। আর মুহাম্মাদ (সঃ) ছিলেন আল্লাহ্‌র প্রেরিত শেষ নবী ও রসূল। তাই উনার জীবনী অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর মূল্যবান আমাদের মুসলিমদের জন্য। তাই পরের প্রজন্মের কাছে লোকজন (যারা রসূল সঃ কে নিজেদের জীবদ্দশায় পেয়েছিলেন) রসূল (সঃ) জীবনের সবকিছুই প্রচার করতো। পরের প্রজন্ম তো দুরের কথা বরং রসূল (সঃ) এর জিবিত থাকা অবস্থায় যেইসকল ব্যক্তিরা কোন কাজে দূরে কোথাও যেতো অথবা মদিনায় থাকতো না তারা এসেই বাকি লোকদের জিজ্ঞাস করতো আজকে রসূল (সঃ) কি কি বলেছেন ? রসূল (সঃ) এর সময়ে লোকজন এভাবেই ভালোবেসে আল্লাহ্‌র রসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কথা ও কাজকর্ম একে অপরের কাছে বলতো এতে কোন সমস্যা তৈরি হয়নি।
কিন্তু রসূল (সঃ) এর ইন্তেকালের পর লোকেরা যখন পরের প্রজন্মের কাছে রসূল (সঃ) এর ব্যপারে হাদিস বলা শুরু করলো তখন স্বাভাবিক অনেকেই খুব আগ্রহ নিয়ে বৈঠক বসিয়ে প্রশ্ন করে (সঃ) এর জীবনের খুটিনাটি সব জানতে চাইতো। তাই সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে শুনত। যেমনটা আমরা পূর্বেও দেখেছি কোন বিষয়ে মুরুব্বিরা কথা তুললে সবাই মিলে খুব আগ্রহের সাথে সেই মুরুব্বীকে ঘিরে ধরে বসতো যে গল্প বলতো। এগুলা মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। এমনটাই হয়ে থাকে সবসময় এইটাই স্বাভাবিক। এইভাবে হাদিস বলার ক্ষেত্রে সাহাবিদের মধ্যে দুই ধরনের স্বভাবের লোক ছিলো। এক্ষেত্রে একটি স্বভাবের সাহাবী এমন ছিলো যে খুব জরুরি না হলে তারা রসূল (সঃ) এর কোন হাদিস প্রচার করতেন না। অনেকেই এমন ছিলো তার মধ্যে দুইজন এমন ব্যক্তির কথা বলি যাদেরকে আপনারা চিনেন, একজন হচ্ছে হযরত ওমর (রাযি) এবং আরেকজন আবু বকর (রাযি) ! এছাড়াও আরো অনেকেই ছিলো যারা মনে করতেন রসূল (সঃ) এর নামে কোন হাদিস বর্ণনা করতে গিয়ে তাতে যদি একটুও কম বেশি হয় তাহলে সেই কারনে জাহান্নামে যেতে হবে। যেমনটা রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আমি যা বলি নি তা যে আমার নামে বলবে তার আবাসস্থল জাহান্নাম। (বুখারি, কিতাবুল ঈমান) । হাদিসের কিতাবগুলোতে খেয়াল করলে দেখবেন আবুবকর ও ওমর (রাযি) থেকে একদম অল্প কয়েকটি হাদিস পাওয়া যায়। এবার আসি দ্বিতীয় ক্যাটাগরির সাহাবীদের ব্যপারে, এই দ্বিতীয় প্রকারের মধ্যেও অনেকেই আছে তার মধ্যে পরিচিত অন্যতম একজনের নাম বলি, যেমন হযরত আবু হুরায়রা (রাযি)। উনি চিন্তা করেছেন লোকজন চেহেতু অনেক আগ্রহ নিয়ে রসূল (সঃ) এর হাদিস জানতে চায় আর আমারো জানা আছে আর অনেক কিছুই আমি শুনেছি তাই আমি মানুষকে হাদিস বলবো। আর মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই এই দুই ধরনের মানুষ হয়ে থাকে, কেউ একটু সাবধানতা অবলম্বন করে আর কেউ একদম আমভাবে কথা প্রচার করতে থাকে।
একটু চিন্তা করে দেখুন হযরত আবুবকর (রাযি) যখন মুসলমান হয়েছিলেন সেটা একদম প্রথম দিকে। প্রথম সময়েই যারা রাসুলের (সঃ) দাওয়াতে ঈমান এনেছিলো সেই ৪-৫ জনের মধ্যে আবুবকর (রাযিঃ) ছিলেন একজন। আল্লাহ্‌র রাসুলের (সঃ) সব সময়ের সাথি ছিলেন তিনি। এমনকি লোকজন বলতো যখনি আমরা আল্লাহ্‌র রসূলকে (সঃ) দেখতাম তখনি দেখতাম এক পাশে আবুবকর আরেক পাশে ওমর। এমনকি মদিনায়, বিভিন্ন যুদ্ধে, এবং সব সময়েই আবুবকর ছিলেন রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সঙ্গী। অপরদিকে বংশগত একটা সম্পর্কও ছিলো যেমন উনার মেয়ে আয়েশার (রাযি) সাথে রসূল (সঃ) এর বিয়ে হয়েছিলো। তাই স্বাভাবিকভাবেই সবসময় আসা যাওয়া ছিলো তার। এমনকি রসূল (সঃ) মক্কা থেকে যখন মদিনায় হিজরত (সফর) করেন তখনও সঙ্গী ছিলো আবুবকর। অপরদিকে রসূল (সঃ) এর জিবনের শেষের দিকে মক্কা বিজয়ের কিছুদিন আগে মুসলিম হয়েছিলো সাহাবী আবু হুরায়রা (রাযি)। একদিকে প্রায় পুরো ২৩ বছরের রসুলের (সঃ) সঙ্গী আবুববকর, অপরদিকে দুই থেকে আড়াই বছর রসূল (সঃ) কে পেয়েছেন আবু হুরায়রা (রাযি) । কিন্তু উভয়ের হাদিস বর্ণনার তফাৎ আকাশ পাতাল পরিমান। আবুবকর (রাযি) থেকে হাদিস বর্ণিত হয়েছে বড়জোর ৮০ থেকে ১০০ টির মত। তাও খুব দরকার হয়েছিলো বলেই তিনি সেই বিষয়ে হাদিস বলতেন যেমনটা আপনারা ‘মুসনাদে আহমাদ’ পড়লেই বুঝবেন। আর আবু হুরায়রা (রাযি) থেকে হাদিস বর্ণিত হয়েছে ৫৩০০+ (পাঁচ হাজার তিনশত এর বেশি) !!! কিছু সাহাবী বাদে বাকি সাহাবীগনের এই উদ্দেশ্য থাকতো না যে তারা লোকেদের শুধু হাদিস বলে বেড়াবে। উনারা হাদিস প্রচারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতেন এবং কোন বিশেষ প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন হলে,অথবা রসূল (সঃ) এর ব্যপারে কোন ব্যপারে কথাবার্তা উঠলে, অথবা কেউ কোন ব্যপারে জিজ্ঞাস করলে তারা ঐ বিষয়ের হাদিসটি বলতেন। সাহাবীদের মধ্যে যারা একটু বেশি জ্ঞানী ছিলেন তারা এভাবেই বিশেষ দরকার না হলে হাদিস আমভাবে প্রচার করতো না। যেমন, সাহাবী আবুবকর সিদ্দিক (রাযি), ওমর (রাযি), আয়েশা (রাযি), মুয়ায বিন জাবাল (রাযি), হযরত আলী (রাযি) ইত্যাদি ।
তারপর আসলো সাহাবীদের পরের প্রজন্ম। প্রথম সময়ে তো সাহাবীগণ এইভাবে হাদিস বলতেন যে, আমরা রসূল (স:) কে দেখেছি এটা করতে, বা এইটা বলতে। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের লোকেরা (তাবেয়ী) বলতেন যে, অমুক ব্যক্তি আমাকে বলেছেন যে রসূল (সঃ) বলেছেন...। এরপর আসলো তার পরবর্তী (তাবাতাবেয়ী) প্রজন্ম। আর তখন কেউ কেউ হাদিস এভাবে বলতেন যে আমি শুনেছি আমার বাবার কাছে (তাবেয়ী) আর আমার বাবা বলেছিলো তিনি শুনেছেন অমুকের কাছে (সাহাবীর) কাছে যে রাসুল (সঃ) বলেছেন...। এক্ষেত্রে পরের প্রজন্মের কেউ কেউ মাঝখানের ব্যক্তিগুলোর নাম বলার প্রয়োজন মনে করতেন না। বরং সরাসরি বলে দিতো রাসুল (সঃ) বলেছেন ... । যেমন ইমাম মালেক (রহ) যিনি একজন বড় ইমাম ও মুহাদ্দিস ছিলেন আর উনার মুয়াত্তা গ্রন্থ প্রথম হাদিসের কিতাব হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়। উনি সরাসরি অনেক তাবেয়ি থেকে হাদিস শুনেছেন। কিন্তু উনিও কিছু কিছু হাদিস বলার ক্ষেত্রে সরাসরি বলে দিতেন যে আমি এভাবেই হাদিসটি রসূল (সঃ) থেকে পেয়েছি। এইটাও বলতেন না যে কার মাধ্যমে পেয়েছেন। কারন উনারা এই ব্যপারে শিওর থাকতেন যে হাদিসটি ঠিক আছে। তাই প্রয়োজন মনে করতেন না যে কার থেকে শুনেছেন এইটা প্রকাশ করার। আবার অনেক ক্ষেত্রে এমন হত যে মুহাদ্দিসগণ বলতেন আমি এমন একজন ব্যক্তির কাছে এই হাদিসটি শুনেছি যে আমার নিকট বিশ্বস্ত । এক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তির নামও বলার প্রয়োজন মনে করতেন না, এমনটাও হত হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে। তবে ঐ সময়ে এইরূপ হবার কারন ছিলো ঐ জামানায় (রসুলের (সঃ) দুই প্রজন্ম পরে) এত বেশি মিথ্যাবাদী ছিলো না আর রসুলের (সঃ) নামে এত বেশি মিথ্যা কথাও বলা হত না। মিথ্যাবাদী তখনও ছিলো কিন্তু এত বেশি ছিলো না।
যখন কেউ বলতো যে আমি রাসুলের (সঃ) অমুক কথা জানি তখন তাকে সবাই ঘিরে ধরতো হাদিস শুনার জন্য। কোন মজলিশে রাসুল (সঃ) এর হাদিস বলার সময় সবাই ঐ লোককে ঘিরে ধরতো যে হাদিস বলতো। আর এমনটাই স্বাভাবিক। আর তখনি সমস্যা তৈরি হয়েছে, অনেকে রাসুলের (সঃ) নামে মিথ্যা কথা, গল্প কিচ্ছা বলা শুরু করতো নিজে থেকে। আর আমভাবে এমনটাই ছড়িয়ে পড়েছিলো। কারন তাকে লোকেরা সম্মান করতো আর বাহবা দিতো। আবার মানুষ যাতে আমলের প্রতি আগ্রহি হয় এই কারনে অনেকেই এমন হাদিস বানিয়ে বানিয়ে বলতো যে অমুক আয়াত পড়লে এত নেকি, অমুক দোয়া পড়লে এমন নেকি, এতবার অমুক জিকির করলে এত লাখ নেকি ! অনেক ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ যখন এমন হাদিসের ব্যপারে এই লোকদের খবর নিয়ে যখন জিজ্ঞাস করতো তখন তারা নিজেই স্বীকার করতো যে মানুষ কুরআন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তাই আমি এমনটা বলেছি যাতে কুরআন পড়তে আগ্রহি হয় বা আমলের প্রতি ঝুকে যায়। কিছু কিছু লোক হাদিস বানিয়ে বলাটা দ্বীনের খেদমত মনে করতো, তাই তারা ফজিলেতের নামে বানিয়ে বানিয়ে হাদিস বলে দিতো যাতে মানুষ আমল করে। এমনো সুফি টাইপের মানুষ ছিলো যারা মসজিদে নববিতে বসে বসে সারাদিনরাত ইবাদাত করতো আর যা শুনত তাই বলে বেড়াতো হাদিসের নামে। ইমাম মুসলিম তো বলেছেন, ‘’এই
ধরনের লোকদের মুখ দিয়ে মিথ্যা কথা পানির স্রোতের মত প্রবাহিত হত।’’ এত পরিমান মিথ্যা হাদিস তারা বলতো । এই ধরনের সুফি লোকেদের মুখ থেকে যেসকল মিথ্যা হাদিস আর গল্প কিচ্ছা বর্ণিত হয়েছে এগুলা এখন অনেক ইসলামি দলের মূল কিতাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আছে। উনারা রাসুল (সঃ) এর নামে অনেক ভাল ভাল কথা সুন্দর করে বানিয়ে বলতো, এই কারনে মুহাদ্দিসগণ উনাদের এই মিথ্যা হাদিস বলার ব্যপার নিয়েও বই লিখেছেন ।




ঐ সময়টাতে কয়েকজন মুহাদ্দিস (যারা হাদিস সংগ্রহ করেছেন) তৈরি হলেন যারা মনে করলেন লোকেদের মুখের বলা হাদিসগুলো আমরা যাচাই বাছাই করে দেখবো। এক্ষেত্রে সবগুলো মানুষের মুখে শোনা হাদিসগুলোর অংশ দুই ভাগে ভাগ করা হল। একটি হচ্ছে ‘’সনদ’’। হাদিসের মূল কথাটুকু যে সূত্র পরম্পরায় গ্রন্থ সংকলনকারী পর্যন্ত পৌঁছেছে তাকে সনদ বলা হয়। এতে হাদিস বর্ণনাকারীদের নাম একের পর এক সজ্জিত থাকে। সনদ হচ্ছে হাদিস বলার চেইন বা ধারাবাহিকতা। যেমন, আমি হাদিস শুনেছি আব্দুল্লাহর কাছে, আবদুল্লাহ হাদিসটি শুনেছে আব্দুর রহমান থেকে,আব্দুর রহমান শুনেছে তার পিতা অমুকে কাছে, তিনি বলেছেন রসূল (সঃ) বলেছেন ... ! এই ধারাবাহিকতাকে বলা হয় ‘’সনদ’’।
আরেকটি হচ্ছে ‘’মতন’’ (কথা বা মূল কথার অংশ)। ‘’মতন’’ হচ্ছে সেই কথা বা কথার মূল শব্দ যেটা রসুল (সঃ) বলেছেন বলে পেশ করা হয়। সনদের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ কিছু শর্ত তৈরি করলেন যে যারা এই হাদিস বলেছে তাদের ব্যপারে তারা এই যাচাই বাছাই করা হবে যে তারা কেউ মিথ্যাবাদী ছিলো কিনা ? আমানতের খেয়ানত করতো কিনা কারো সাথে ? তাদের ঈমান আমল ঠিক ছিলো কিনা ? তাদের স্মরণশক্তি ভাল ছিলো বা কথা ভুলে যেতো কিনা ? তারা যাদের কাছে হাদিসটি শুনেছে (ধারাবাহিকতা) ঠিক আছে কিনা ? যেমন আমি বললাম আমি আবদুল্লাহ থেকে হাদিসটি শুনেছি অথচ আমার জীবনী ঘেটে দেখা গেলো আমি জন্মের এক বছর আগেই আবদুল্লাহ মারা গিয়েছিলো। এভাবে সনদ বা ধারাবাহিকতার ব্যপারে উনারা নিজেদের সাধ্যমত খুব পরিশ্রম করে প্রায় এক লাখেরও বেশি ব্যক্তির জীবনী উনারা যাচাই বাছাই করেছেন।


‘’মতন’’ বা কথার ক্ষেত্রেও উনারা যাচাই বাছাই করেছেন। মতন হচ্ছে হাদিসে রসূল (সঃ) এর কথা, কাজ, ও এমন কিছু যেক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র রসুলের (সঃ) সামনে এমন কিছু হলে যেটা দেখে তিনি চুপ ছিলেন বা নিরব ছিলেন। এক্ষেত্রেও মুহাদ্দিসগন কিছু শর্ত তৈরি করলেন। একটি হচ্ছে হাদিসে কুরআন আর সুন্নাতের বিপরিত কিছু বলা হচ্ছে কিনা। কারন কুরআন ও সুন্নাত আমাদের কাছে একদম পরিস্কারভাবেই উপ্সথিত আছে। তাই কুরআন সুন্নাহর বিপরিত হলে সেই হাদিস গ্রহন করা হবে না। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে জ্ঞান ও বিবেকের পরিপন্থী হলে সেই হাদিস গ্রহন করা হবে না। এর অর্থ সাধারনভাবে সবার কাছেই যদি মনে হয় এই কথা বা হাদিস জ্ঞান ও বিবেক পরিপন্থী তাহলে সেটা গ্রহন করা হবে না। এই শর্তে উনারা হাদিসের মতন বা কথাগুলোকেও যাচাই বাছাই করেছেন। সনদ ও মতনের ক্ষেত্রে এমন লাখ ব্যক্তির ব্যপারে উনারা যাচাই বাছাই করেছেন। তবে খেয়াল করতে হবে উনারা এই কাজ করার সময় সবাই একত্র হয়ে কনফারেন্স করে এই কাজ করেনি, বরং নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ী নিজে জ্ঞান বুদ্ধি বিবেক খরচ করে এই কাজগুলো করেছেন। যখন মানুষ নিজের জ্ঞান দিয়ে কোন কাজ করে তখন একে অপরের সাথে এখতেলাফ বা মতবিরোধ হয় এটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগন নিজেরা আলাদা আলাদা বই লিপিবদ্ধ করেছেন। যেমন ইমাম মালেক নিজের আলদা বই লিখেছেন যেটা আমরা মুয়াত্তা ইমাম মালেক হিসেবে চিনি, ইমাম আহমাদের ‘মুসনাদে আহমাদ’, ইমাম বুখারিও নিজের বই লিখেছেন, ইমাম মুসলিম নিজের বই লিখেছেন, উনাদের ছাত্ররাও আলাদা আলাদা বই লিপিবদ্ধ করেছেন। উনারা হচ্ছেন সেই সকল ব্যক্তি যারা কষ্ট করে এই বইগুলোতে হাদিস সংগ্রহ করে আমাদের মুসলিম উম্মতকে অনেক বড় সম্পদ হিসেবে দিয়ে গিয়েছেন। যেই কিতাবগুলোর মাধ্যমে আমরা আমাদের রসূল মুহাম্মাদ (সঃ) এর পবিত্র জীবনের রেকর্ড খুজে পাই। কিন্তু দ্বীন শুধুমাত্র ‘’কুরআন ও সুন্নাতের’’ মদ্ধেই সীমাবদ্ধ। এই সবগুলো হদিসের কিতাব না থাকলেও দ্বীনের কোন ক্ষতি হত না।
ঠিক একইভাবে হাদিসে আমাদের নবী (সঃ) এর ফিকহ বর্ণনা হত। ‘’ফিকহ’’ হচ্ছে যেমন, আপনি নামাজ পড়ার নিয়ম আলেমদের কাছে জেনে নিয়েছেন কিন্তু আজকে আপনার পা অনেক ব্যথার কারনে আপনি পা সামনের দিকে লম্বা করে বিছিয়ে দিয়ে নামাজ আদায় করেছেন তাই আলেমকে জিজ্ঞাস করলেন যে এতে আপনার নামাজ হয়েছে কিনা ? আর আলেম তখন কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে আপনাকে সেটার একটা সমাধান দিবে, এটাই হচ্ছে ফিকহ। রাসুল (সঃ) এর সময়েও মানুষ এই ধরনের বহু বিষয়ে প্রশ্ন করতেন এবং (সঃ) উত্তর দিতেন আর এই ‘’ফিকহুন নবী’’ গুলোও হাদিসে বর্ণিত আছে। এবং রসূল (সঃ) এর পবিত্র জিবনিও হাদিসে লিপিবদ্ধ আছে আর আল্লাহ্‌ও বলেছেন তোমাদের জন্য রাসুল (সঃ) এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ । (৩৩ঃ২১) আর রাসুলের (সঃ) জীবনের খুঁটিনাটি আমরা হাদিস থেকে পাই। তাই হাদিসের ব্যপারে ইফরাদ ও তাফরিদ (চরমপন্থা ও অবহেলা) তৈরি হয়েছে। কেউ বলে সুন্নাত ও হাদিস একই জিনিস ! উনারা মনে করে দ্বীন হাদিসের মাধ্যমেই আমাদের কাছে এসেছে। যেমন কুরআন মাজিদে দ্বীন পেয়েছি তেমনি হাদিসের মাধ্যমে দ্বীন এর বাকি অংশ এসেছে ! এই ধারনা একদম ভুল। যেমনটা উপরে বিস্তারিত বলেছি যে হাদিসে সবকিছুই বলা হয়েছে যেমন সুন্নাহর বিষয়ে, কুরআন এর আয়াতের ব্যাখ্যা, কোন ঘরোয়া আমল, যুদ্ধের সময়ের কোন বিষয় বা সামাজিক কোন কথাবার্তা অথবা কেউ প্রশ্ন করলে রাসুল (সঃ) উত্তর দিয়েছেন এমন সব কিছুই। কিন্তু মনে রাখতে হবে পুরো দ্বীন কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে এক উম্মত থেকে আরেক উম্মতের কাছে এখন পর্যন্ত চলে এসেছে । যেমন আমরা কুরআন পেয়েছি ঠিক একইভাবে সুন্নাত পেয়েছি। আর প্রমানিত সুন্নাতের ক্ষেত্রে কারো কোন দ্বিমত নেই কারন সবগুলো সুন্নাত পূর্বের নবীদের থেকে এবং রাসুল (সঃ) থেকে দ্বীন হিসেবে প্রমানিত। আর কুরআন মাজিদের সাথেও এর কোন বিরোধ নেই।

আর দ্বিতীয় এই সমস্যা তৈরি হয়েছে যে, যখন একদল দেখতে পেলো হাদিস তো মানুষের মুখ থেকে শোনা কথা আর অনেকেই রাসুল (সঃ) এর নামে মিথ্যা হাদিস তৈরি করেছিলো , আবার অনেক বিষয় উনাদের বুঝের বাইরে চলে গিয়েছিলো, অনেক হাদিস কুরআন সুন্নাহর বিপরিত হয়ে যায়, তাই তারা চিন্তা করলো এই সব হাদিসই আমরা বর্জন করি ! উপরের উভয়ের ধারনাই চরমপন্থা অথবা অবহেলা। সঠিক বিশ্বাস হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ একদম বিশুদ্ধভাবে আমাদের কাছে উপ্সথিত আছে। এতে কারো সাথেই কোন এখতেলাফ নেই। এমন কোনদিন হয়নি যে রসুল (সঃ) থেকে এখন পর্যন্ত পুরো উম্মত নামাজ পড়া বাদ দিয়ে দিয়েছে, অথবা কোন এক বছর রোজা বাদ দিয়েছে বা হজ্জ করেনি বা যাকাত দেয়নি। বরং প্রতিদিন মুসলিমদের আমল ও দাওয়াতের মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম পর্যন্ত কুরআন ও সুন্নাহ চলে এসেছে। আর হাদিস হলো আমাদের শেষ নবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর জীবনী । আর রাসুল (সঃ) এর জীবনী আমাদের জন্য পথ চলার আলো। তিনি কিভাবে দাওয়াতের কাজ করেছেন কিভাবে কথা বলেছেন চলাফেরা করেছেন এগুলো থেকে আমরা শিক্ষাগ্রহন করবো । আমার দ্বীনের দাওয়াতের ব্যপারে
উম্মতভাবে কথাই বলতে পারতাম না যদি হাদিস থেকে এটা জানতে না পারতাম যে কিভাবে দ্বীন প্রচার করতে হয়।

আমরা মুসলিমরা সবাই অবশ্যই অবশ্যই দ্বীন বুঝার চেষ্টা করবো এবং আমাদের নবী (সঃ) এর পুরো জীবনী থেকে শিক্ষাগ্রহন করবো। আর হাদিসের ক্ষেত্রে কোন প্রকার গোরামি বা অবহেলা করবো না। আলেমদের থেকে দ্বীন শিখবো দলিল প্রমান সহকারে। কোন একটি হাদিস কেউ পেশ করলে আমরা সেটা যাচাই বাছাই করে দেখবো যে কুরআন সুন্নাহর সাথে মিল আছে কিনা। আমাদের উচিৎ ধর্মের ব্যপারে সিরিয়াস হওয়া। তানাহলে মনের অজান্তে কেউ আমাদের দ্বীন নষ্ট করে দিবে আর আমরা বুঝতেও পারবো না। কষ্ট করে পুরো নোট পড়ার জন্য আল্লাহ্‌ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।
আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!

Post a Comment

0 Comments