পিতামাতার অবাধ্যতার পরিণাম। এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে শুরু করছি



মাসুম ও সজিব দুই বন্ধু। এক সাথে খেলা করে। এক সাথে স্কুলে যায়। আর এক সাথে একই ক্লাসে পড়াশুনা করে। পড়াশুনায় দুই জনেই ভালো।

মাসুম কখনো তার পিতামাতার অবাধ্য হয় না। তারা যা বলেন, তাই সে মেনে চলে। এজন্য পিতামাতা তার প্রতি খুবই খুশি। সজিব সম্পূর্ণ উল্টো। সে তার পিতামাতার কথা শুনতেই চায় না। তারা যদি বলেন, ডান দিকে যাও। সে যায়, বাম দিকে। বাম দিকে যেতে বললে, যায় ডান দিকে। এজন্য তার পিতামাতার দুঃখের শেষ নেই। তারা সব সময় আল্লাহর কাছে সন্তানের কল্যাণ কামনা করে দু‘আ করেন। এক দিন সজিবের মা নামায শেষে দু’হাত তোলে আল্লাহর কাছে সন্তানের জন্য অনেক কান্নাকাটি করেন। তিনি বলেন, ‘হে আল্লাহ তুমি আমার ছেলেকে আমাদের বাধ্য করে দাও, সে যেনো আমাদের কথা শুনে এবং মেনে চলে।’ দু‘আ শেষে পিছনে ফিরে দেখেন, ছেলে দাড়িয়ে আছে। ছেলে মায়ের মন খারাপের কারণ জানতে চাইলে- মা বলেন: বাবা সজিব আমি তোমাকে একজন সাহাবীর গল্প শুনাবো। তুমি কী শুনবে? ছেলে খুশি হয়ে বলে, হ্যাঁ, মা শুনবো। তুমি বল।

ছেলে মায়ের কাছে বসলে মা গল্প বলতে শুরু করেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে আলকামা নামে মদীনায় এক যুবক বাস করতো। সে নামায, রোযা ও সাদকার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদাত বন্দেগীতে অত্যন্ত অধ্যবসায় সহকারে লিপ্ত থাকতো। একবার সে কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে তার স্ত্রী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে খবর পাঠালো যে, “আমার স্বামী আলকামা মুমূর্ষ অবস্থায় আছে। হে রাসূল, আমি আপনাকে তার অবস্থা জানানো জরুরি মনে করছি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তৎক্ষণাৎ হযরত আম্মার, সুহাইব্ ও বিলাল রাদিআল্লাহু আনহু কে তার কাছে পাঠালেন। তাদেরকে বলে দিলেন যে, “তোমরা তার কাছে গিয়ে তাকে কালেমায়ে শাহাদাত পড়াও।” তারা গিয়ে দেখলেন, আলকামা মুমূর্ষ অবস্থায় আছে। তাই তারা তাকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” পড়াতে চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু সে কোনো মতেই কালেমা উচ্চারণ করতে পারছিল না।

অগত্যা তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে খবর পাঠালেন যে, আলকামার মুখে কালেমা উচ্চারিত হচ্ছে না। যে ব্যক্তি এই সংবাদ নিয়ে এসেছিল, তার কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন: “আলকামার পিতামাতার মধ্যে কেউ কি জীবিত আছে?” সে বললো, “হ্যাঁ রাসূল, তার বৃদ্ধা মা কেবল বেঁচে আছেন।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তৎক্ষণাৎ আলকামার মায়ের কাছে পাঠালেন এবং তাকে বললেন, “তাকে গিয়ে বল যে, তুমি যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যেতে পার তবে চল, নচেত অপেক্ষা কর, তিনি তোমার সাথে সাক্ষাত করতে আসছেন।” দূত আলকামার মায়ের কাছে উপস্থিত হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন তা জানালে আলকামার মা বললেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য আমার প্রাণ উৎসর্গ হোক। তার কাছে বরং আমিই যাবো।” বৃদ্ধা লাঠিতে ভর দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে সালাম করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালামের জবাব দিয়ে বললেন, “ওহে আলকামার মা, আমাকে আপনি সত্য কথা বলবেন। আর যদি মিথ্যা বলেন, তবে আল্লাহর কাছ হতে আমার কাছে ওহী আসবে। বলুনতো, আপনার ছেলে আলকামার স্বভাব চরিত্র কেমন ছিল?”

বৃদ্ধা বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল! সে প্রচুর পরিমাণে নামায, রোযা ও সাদকা আদায় করতো।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “তার প্রতি আপনার মনোভাব কী?” বৃদ্ধা বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “কেন?” বৃদ্ধা বললেন, “সে তার স্ত্রীকে আমার উপর অগ্রাধিকার দিত এবং আমার আদেশ অমান্য করতো।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আলকামার মায়ের অসন্তুষ্ট হেতু কালেমার উচ্চারণে আলকামার জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে গেছে।” তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হে বিলাল যাও, আমার জন্য প্রচুর পরিমাণে কাষ্ঠ জোগাড় করে নিয়ে আস।” বৃদ্ধা বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, কাষ্ঠ দিয়ে কী করবেন?” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমি ওকে আপনার সামনেই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেব।” বৃদ্ধা বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল। আমার সামনেই আমার ছেলেকে আগুন দিয়ে পোড়াবেন। আমি তা সহ্য করতে পারবো না।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “ওহে আলকামার মা, আল্লাহর আযাব এর চেয়েও কঠোর এবং দীর্ঘস্থায়ী। এখন আপনি যদি চান যে, আল্লাহ আপনার ছেলেকে মাফ করে দিক, তাহলে তাকে আপনি মাফ করে দিন এবং তার উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। নচেত যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ তার কসম, যতক্ষণ আপনি তার উপর অসন্তুষ্ট থাকবেন, ততক্ষণ নামায, রোযা ও সাদকা দিয়ে আলকামার কোনো লাভ হবে না।” একথা শুনে আলকামার মা বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল, আমি আল্লাহকে, আল্লাহর ফেরেশতাদেরকে এবং এখানে যে সকল মুসলমান উপস্থিত তাদের সকলকে সাক্ষী রেখে বলছি যে, আমি আমার ছেলে আলকামার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে গেছি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “ওহে বিলাল, এবার আলকামার কাছে যাও। দেখ, সে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলতে পারে কিনা। কেননা, আমার মনে হয়, আলকামার মা আমার কাছে কোনো লাজ লজ্জা না রেখে যথার্থ কথাই বলেছে।”

হযরত বিলাল রাদিআল্লাহু আনহু তৎক্ষণাত গেলেন। শুনতে পেলেন, ঘরের ভেতর থেকে আলকামা উচ্চস্বরে উচ্চারণ করছে, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু”। অতঃপর বিলাল গৃহে প্রবেশ করে উপস্থিত জনতাকে বললেন: শুনে রাখ, আলকামার মা অসন্তুষ্ট থাকার কারণে সে প্রথমে কালেমা উচ্চারণ করতে পারে নি। পরে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়ায় তার জিহ্বা কালেমা উচ্চারণে সক্ষম হয়েছে। অতঃপর আলকামা সেদিনই মারা যায় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে উপস্থিত হয়ে তার গোসল ও দাফনের নির্দেশ দেন, জানাযার নামায পড়ান ও দাফনে শরীক হন। সজিব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল সাহাবী আলকামা রাদিআল্লাহু আনহুর জীবনের করুন কাহিনী। আর দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল। মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে সে প্রতিজ্ঞা করে জীবনে আর কখনো পিতামাতার অবাধ্য হবে না। তাদের কথা কখনো অমান্য করবে না। লেখক/কবি/সাহিত্যিক/প্রাবন্ধিক 
আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!

Post a Comment

0 Comments