যেনে নিন আশুরা কি আনন্দ না শোক দিবস?

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে শুরু করছি

আমাদের সম্মুখে উপস্থিত পবিত্র মাস মুহাররম। এ মাসে এমন একটি দিবস রয়েছে যাকে মানুষ বিভিন্নভাবে উদযাপন করে। সেটি হলো আশুরা দিবস। এদিন দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে যে কারণে এ দিবসের আমলে ভিন্নতা দেখা যায়। 

প্রথম ঘটনা :

গোত্রসহ মুসা আলাইহিস সালামের পরিত্রাণ ও সদলবলে ফেরাউনের পতন :

ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহুমার উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেন, 

ﻟَﻤَّﺎ ﻗَﺪِﻡَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲُّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﺍﻟﻤَﺪِﻳﻨَﺔَ ﻭَﺟَﺪَ ﺍﻟﻴَﻬُﻮﺩَ ﻳَﺼُﻮﻣُﻮﻥَ ﻋَﺎﺷُﻮﺭَﺍﺀَ، ﻓَﺴُﺌِﻠُﻮﺍ ﻋَﻦْ ﺫَﻟِﻚَ، ﻓَﻘَﺎﻟُﻮﺍ : ﻫَﺬَﺍ ﺍﻟﻴَﻮْﻡُ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺃَﻇْﻔَﺮَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻓِﻴﻪِ ﻣُﻮﺳَﻰ، ﻭَﺑَﻨِﻲ ﺇِﺳْﺮَﺍﺋِﻴﻞَ ﻋَﻠَﻰ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ، ﻭَﻧَﺤْﻦُ ﻧَﺼُﻮﻣُﻪُ ﺗَﻌْﻈِﻴﻤًﺎ ﻟَﻪُ، ﻓَﻘَﺎﻝَ ﺭَﺳُﻮﻝُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ : ‏« ﻧَﺤْﻦُ ﺃَﻭْﻟَﻰ ﺑِﻤُﻮﺳَﻰ ﻣِﻨْﻜُﻢْ، ﺛُﻢَّ ﺃَﻣَﺮَ ﺑِﺼَﻮْﻣِﻪِ »
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করে দেখলেন স্থানীয় ইহুদীরা আশুরা দিবসে রোযা পালন করছে। ফলে তাদেরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলো। তারা উত্তর দিল এ এমন এক দিবস যাতে আল্লাহ তা‘আলা মুসা আলাইহিস সালামকে বিজয়ী করেছিলেন এবং বানী ইসরাঈলকে ফেরাউনের ওপর আধিপত্য দান করেছেন। এ দিনে সম্মানার্থে আমরা সিয়াম পালন করি। এতদশ্রবণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, ‘তাহলে তো এ দিন রোযা রাখার ব্যাপারে আমরাই অধিক হকদার। অতপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিবসে রোযা রোযা পালনের নির্দেশ দেন। (বুখারী : ৩৯৪৩; মুসলিম : ১১৩০)

দ্বিতীয় ঘটনা :   

নবী দৌহিত্র হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহুর শাহাদাত বরণ:  

ইরাকের কারবালা প্রান্তরে মর্মবিদারক এ ঘটনাটি ঘটেছিল ৬১ হিজরির পবিত্র জুমাবারে।[আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ১১/৫৬৯] এটি ছিল উম্মতের ওপর নেমে আসা সবচে বড় বিপদগুলোর একটি।

আল্লামা ইবনু তাইমিয়া রহ. বলেন, ‘হুসাইনের রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু শাহাদতের ঘটনাটি মহা বিপদগুলোর একটি। কারণ, হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু এবং তাঁর আগে উসমান রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু-এর শহীদ হওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়েই পরবর্তীতে উম্মতের ওপর নেমে এসেছে অনেক মহা দুর্যোগ। আর তাঁদের শহীদ করেছে আল্লাহর নিকৃষ্ট বান্দারা। [মাজমু‘ ফাতাওয়া ৩/৪১১]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিন রোযা রাখতে বলেছেন, মুসা আলাইহিস সালামের মুক্তি ও ফেরাউনের ভরাডুবির শুকরিয়া হিসেবে। এ রোযার সঙ্গে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহুর শাহাদতের কোনো সম্পর্ক নেই। এ দিবস সম্পর্কে শুদ্ধ-অশুদ্ধ অনেক হাদীস বর্ণনা করা হয়। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এর মাহাত্ম্য রোযা পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর আশুরার ব্যাপারে এটিই মধ্যমপন্থী এবং সঠিকতম দৃষ্টিভঙ্গি। [দেখুন, লাতায়েফে মাআরেফ : ১০২-১১৩]

• আশুরার ব্যাপারে দুটি শ্রেণী বিভ্রান্তিতে রয়েছে : 

প্রথম দল : নাসেবিয়া, এরা আশুরা দিবসে আনন্দ-উৎসব পালন করে। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের কিছু লোকও আছে, যারা এ ব্যাপারে ভুলের শিকার। তারা এ দিনে গোসল করা, মেহেদি ও সুরমা লাগানো ইত্যাদি আনন্দ প্রকাশক কাজ করে। এমন করার উদ্দেশ্য, যারা এ দিনটিকে শোক দিবস হিসেবে পালন করে তাদের বিরুদ্ধাচারণ করা। কিন্তু এটাতো ভ্রান্তির বদলে ভ্রান্তির চর্চা এবং বিদআতকে প্রতিরোধ করা বিদআতের মাধ্যমে। যেমনটি বলেছেন ইবনু তাইমিয়া রহ.। [মাজমু‘ ফাতাওয়া : ৪/৫১৩] 

দ্বিতীয় দল : শিয়াদের কয়েকটি দল এ দিনকে শোক দিবস হিসেবে পালন করে। এদিন তারা গণ্ডাদেশ জখম করে, বুকের কাপড় ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহিলী সব কথাবার্তা বলে। এরা এমন অবস্থায়ও উপনীত হয় যে, নিজে নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত করে। কেউ কেউ তরবারী দিয়ে মাথায় আঘাত করে রক্ত বয়ে দেয়। তাদের দাবী, এভাবে তারা হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহুকে হারানোর বেদনা প্রকাশ করে। এরা নিজেদের তাঁর একান্ত ভক্ত ও অনুসারী বলেও দাবী করে। মিডিয়াগুলোও এমনভাবে প্রচার করে যেন তারাই একমাত্র আহলে বাইত বা রাসূল-পরিবারের ভক্ত। যারা তাদের মতো কাজ করে না তারা আহলে বাইত-এর ভক্ত নয়। এটা একদম নির্জলা মিথ্যাচার। 

কারণ, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতই তো আহলে বাইতকে সর্বাধিক ভালোবাসে। কিন্তু তারা ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে শরীয়ত লঙ্ঘন করে না। নিজেরা নিজেদের আহত ও বিক্ষত করার আসল কারণ- রাফেজিরা যা প্রকাশ করে না তা হলো, তারাই তো হুসাইনকে রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু অসম্মান করেছিল যখন তিনি কুফার ভূমিতে তাদের কাছে এসেছিলেন। [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ১১/৫৩০-৫৩২]

শুধু তাই নয় তারা এর আগে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহুর চাচাতো ভাই মুসলিম ইবন আকিলকেও অপমান করেছিল। এমনকি ইবন জিয়াদ তাঁকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। [প্রাগুক্ত : ১১/৪৮৪-৪৮৮]

সুতরাং তাঁদের সঙ্গে অসম্মান ও বেয়াদবিপূর্ণ আচরণ করার অনুশোচনাতেই তারা মূলত এসব অসংলগ্ন আচরণ করে থাকে। 

• হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহুর শাহাদত সম্পর্কে সঠিক অবস্থান :   

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহুর শাহাদতের ঘটনাকে উম্মতের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বড় বিপদগুলোর একটি গণ্য করে। এজন্য মুসলিমগণ হৃদয়ে গভীর শোক ও অশেষ বেদনা অনুভব করে। কিন্তু তারা শুধু এমন কাজই করেন শরীয়ত যা শিক্ষা দিয়েছে। আর শরীয়তে শোকের সময় ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রজিঊন’ পড়তে শিক্ষা দেয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

﴿ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺇِﺫَﺁ ﺃَﺻَٰﺒَﺘۡﻬُﻢ ﻣُّﺼِﻴﺒَﺔٞ ﻗَﺎﻟُﻮٓﺍْ ﺇِﻧَّﺎ ﻟِﻠَّﻪِ ﻭَﺇِﻧَّﺂ ﺇِﻟَﻴۡﻪِ ﺭَٰﺟِﻌُﻮﻥَ ١٥٦ ﺃُﻭْﻟَٰٓﺌِﻚَ ﻋَﻠَﻴۡﻬِﻢۡ ﺻَﻠَﻮَٰﺕٞ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻬِﻢۡ ﻭَﺭَﺣۡﻤَﺔٞۖ ﻭَﺃُﻭْﻟَٰٓﺌِﻚَ ﻫُﻢُ ﭐﻟۡﻤُﻬۡﺘَﺪُﻭﻥَ ١٥٧ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : ١٥٦ ،   ١٥٧]  
‘আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা, তাদেরকে যখন বিপদ আক্রান্ত করে তখন বলে, (‘ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রজিঊন’) নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। {সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৫৫-১৫৭}  

মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে, উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি ইরশাদ করেন, 

« ﻣَﺎ ﻣِﻦْ ﻋَﺒْﺪٍ ﺗُﺼِﻴﺒُﻪُ ﻣُﺼِﻴﺒَﺔٌ، ﻓَﻴَﻘُﻮﻝُ } : ﺇِﻧَّﺎ ﻟِﻠَّﻪِ ﻭَﺇِﻧَّﺎ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﺭَﺍﺟِﻌُﻮﻥَ { ‏[ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ 156 : ‏] ، ﺍﻟﻠﻬُﻢَّ ﺃْﺟُﺮْﻧِﻲ ﻓِﻲ ﻣُﺼِﻴﺒَﺘِﻲ، ﻭَﺃَﺧْﻠِﻒْ ﻟِﻲ ﺧَﻴْﺮًﺍ ﻣِﻨْﻬَﺎ، ﺇِﻟَّﺎ ﺃَﺟَﺮَﻩُ ﺍﻟﻠﻪُ ﻓِﻲ ﻣُﺼِﻴﺒَﺘِﻪِ، ﻭَﺃَﺧْﻠَﻒَ ﻟَﻪُ ﺧَﻴْﺮًﺍ ﻣِﻨْﻬَﺎ »
‘যে কোনো বান্দা কোনো বিপদের সম্মুখীন হয় অতপর সে বলে, ‘‘নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী”। {বাকারা, আয়াত : ১৫৬} হে আল্লাহ আমাকে আমার বিপদের বদলা দিন এবং এর চেয়ে উত্তম দান করুন।’ আল্লাহ তা‘আলা অবশ্যই তার বিপদের বদলা দেবেন এবং তাকে হারানো জিনিসের চেয়ে উত্তম জিনিস দান করবেন। [মুসলিম : ৯১৮]

ইবনু তাইমিয়া রহ. বলেন, এ ব্যাপারে উদ্ধৃত সবচেয়ে সুন্দর হাদীস বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমদ রহ. এবং ইবনু মাজা রহ.। তাঁরা বলেন, ফাতেমা বিনতে হুসাইন তাঁর পিতা হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 

« ﻣَﻦْ ﺃُﺻِﻴﺐَ ﺑِﻤُﺼِﻴﺒَﺔٍ، ﻓَﺬَﻛَﺮَ ﻣُﺼِﻴﺒَﺘَﻪُ، ﻓَﺄَﺣْﺪَﺙَ ﺍﺳْﺘِﺮْﺟَﺎﻋًﺎ، ﻭَﺇِﻥْ ﺗَﻘَﺎﺩَﻡَ ﻋَﻬْﺪُﻫَﺎ، ﻛَﺘَﺐَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻟَﻪُ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺄَﺟْﺮِ ﻣِﺜْﻠَﻪُ ﻳَﻮْﻡَ ﺃُﺻِﻴﺐَ »
‘যদি কোনো মুসলিম বিপদে আক্রান্ত হয়। তারপর পরবর্তীতে সে বিপদ স্মরণ হলে সে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রজিঊন’ পড়ে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য সে পরিমাণ পুণ্য লিখেন যে পরিমাণ লিখা হয়েছে বিপদে আক্রান্ত হবার দিন।’ [মুসনাদ আহমাদ : ১৭৩৪; ইবনু মাজা : ১৫৯৮;  শায়খ আলবানী হাদীসটিকে
দুর্বল বলেছেন। দেখুন, সিলসিলা যাঈফা : ১০/৫৪।
]  

তাঁরা এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হুসাইন তনয়া ফাতেমা থেকে যিনি ওই মর্মান্তিক ঘটনায় শাহাদত বরণ করেছেন। অথচ হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহুর শাহাদাতের ঘটনা যে যুগে যুগে স্মরণ করা হবে তা কিন্তু অনুমান করা হয়েছিল। অথচ কী তার উদারতা যে তিনি নিজেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে এ সুন্নাত পৌঁছে দিয়েছেন, যাতে যখনই তাঁর এ বিপদের কথা স্মরণ করা হবে তখনই ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রজিঊন’ বলে মুসলমানরা সে দিনের মতো নেকি পেতে পারেন যেদিন এ বিপদ নেমে এসেছিল। [মাজমু‘ ফাতাওয়া : ৪/৫১১-৫১২]

• গালে ছুরি চালানো, বুকে চাপড়ানো এবং নিজেকে ক্ষত-আহত করার যে রেওয়াজ ইদানীং চালু হয়েছে, হলফ করে বলা যায় সেটা হারাম এবং তা শরীয়ত কর্তৃক অনুমোদিত ভালোবাসার মধ্যে পড়ে না।  

ইবন রজব রহ. বলেন, ‘আর হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহুর শাহাদাতের কারণে এ দিনটিকে শোক দিবস হিসেবে গ্রহণ করা- যেমনটি করেছে রাফেজিরা, সে লোকদের কাজ যারা দুনিয়ার পেছনে তাদের চেষ্টা অপচয় করেছে অথচ ভাবে যে, তারা ভাল কাজ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা তো নবী-রাসূলদের মৃত্যুর দিনকেই শোক দিবস হিসেবে পালন করার নির্দেশ দেননি তাহলে তাদের চেয়ে মর্যাদায় কম যিনি তাঁর শাহাদতের দিনকে শোক দিবস হিসেবে পালন করা হবে কিভাবে? [লাতায়েফে মাআরেফ : ১১৩]

তদুপরি খোদ হুসাইন তনয় আলী এবং তাঁর ছেলে মুহাম্মদ কিংবা তাঁর ছেলে জাফর অথবা তাঁর পুত্র মূসা (রাদিআল্লাহু তা‘আলা আনহুম) বা অন্য কোনো হেদায়াতপ্রাপ্ত ইমাম এভাবে গাল কাটা, বুক ফাড়া বা চিৎকার করার মতো অতি আবেগ কখনো প্রকাশ করেছেন বলে জানা যায় নি। এরকম করলে তাঁর পিতা আমীরুল মুমিনীন আলী রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহুই তো এর সর্বোত্তম হকদার ছিলেন। ৪০ হিজরীর ১৭ রমযান পবিত্র জুমাবারে ফজর সালাত পড়তে যাওয়ার সময় তাঁকে শহীদ করা হয়। রাফেজিরা তাঁর এ শাহাদাতের দিনকে শোকের দিন হিসেবে পালন করে না! 

• গালে আঘাত করা, বুকের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা কিংবা নিজে নিজেকে কষ্ট দেয়া অবৈধ, হারাম।  

ইমাম বুখারী এবং মুসলিম রহ. আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

« ﻟَﻴْﺲَ ﻣِﻨَّﺎ ﻣَﻦْ ﻟَﻄَﻢَ ﺍﻟﺨُﺪُﻭﺩَ، ﻭَﺷَﻖَّ ﺍﻟﺠُﻴُﻮﺏَ، ﻭَﺩَﻋَﺎ ﺑِﺪَﻋْﻮَﻯ ﺍﻟﺠَﺎﻫِﻠِﻴَّﺔِ »
‘সে আমাদের উম্মতভুক্ত নয় যে গালে আঘাত করে, বুকের কাপড় ছেঁড়ে এবং জাহেলী কথাবার্তা বলে। [বুখারী : ১২৯৪, মুসলিম : ১০৩]

বুখারী ও মুসলিম রহ. আবূ মূসা আশআরী রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 

ﺃَﻧَﺎ ﺑَﺮِﻱﺀٌ ﻣِﻤَّﺎ ﺑَﺮِﺉَ ﻣِﻨْﻪُ ﺭَﺳُﻮﻝُ ﺍﻟﻠﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ، ‏« ﻓَﺈِﻥَّ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﺑَﺮِﺉَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺼَّﺎﻟِﻘَﺔِ، ﻭَﺍﻟْﺤَﺎﻟِﻘَﺔِ، ﻭَﺍﻟﺸَّﺎﻗَّﺔِ »
‘আমি তাদের থেকে মুক্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের থেকে মুক্ত। আর সাল্লাল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (শোকে) মাথা মুণ্ডনকারিণী, বিলাপকারিণী এবং বুক বিদীর্ণকারিণী থেকে মুক্ত। [বুখারী : ১২৩৪, মুসলিম : ১০৪] 

তেমনি আবূ মালেক আশআরী রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

« ﺃَﺭْﺑَﻊٌ ﻓِﻲ ﺃُﻣَّﺘِﻲ ﻣِﻦْ ﺃَﻣْﺮِ ﺍﻟْﺠَﺎﻫِﻠِﻴَّﺔِ، ﻟَﺎ ﻳَﺘْﺮُﻛُﻮﻧَﻬُﻦَّ : ﺍﻟْﻔَﺨْﺮُ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺣْﺴَﺎﺏِ، ﻭَﺍﻟﻄَّﻌْﻦُ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﻧْﺴَﺎﺏِ، ﻭَﺍﻟْﺎﺳْﺘِﺴْﻘَﺎﺀُ ﺑِﺎﻟﻨُّﺠُﻮﻡِ، ﻭَﺍﻟﻨِّﻴَﺎﺣَﺔُ ‏» ﻭَﻗَﺎﻝَ : ‏« ﺍﻟﻨَّﺎﺋِﺤَﺔُ ﺇِﺫَﺍ ﻟَﻢْ ﺗَﺘُﺐْ ﻗَﺒْﻞَ ﻣَﻮْﺗِﻬَﺎ، ﺗُﻘَﺎﻡُ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﻭَﻋَﻠَﻴْﻬَﺎ ﺳِﺮْﺑَﺎﻝٌ ﻣِﻦْ ﻗَﻄِﺮَﺍﻥٍ، ﻭَﺩِﺭْﻉٌ ﻣِﻦْ ﺟَﺮَﺏٍ »
‘আমার উম্মত জাহেলী যুগের চারটি স্বভাব সহজে ছাড়তে পারবে না। বংশ নিয়ে গর্ব, বংশ তুলে গালি দেয়া, তারকা দেখে বৃষ্টি চাওয়া এবং মৃত ব্যক্তির ওপর বিলাপ করা। তিনি বলেন, বিলাপকারিণী যদি মৃত্যুর আগে তওবা না করে তাহলে কেয়ামতের দিন তাকে এমনভাবে উঠানো হবে যে, তার সর্বাঙ্গ খোস-পাঁচড়া ও আলকাতরায় ভরা থাকবে। [মুসলিম : ৯৩৪]

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া রহ. বলেন, ‘এমনিতেই এসব কাজের নিন্দায় অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তার সঙ্গে যদি মুসলমানের ওপর জুলুম করা, তাদের অভিশাপ দেয়া ও গাল-মন্দ করা এবং তাদের মাঝে অনৈক্য ও ধর্মহীনতার বীজ বপনকারীদের সাহায্য করার মতো অপরাধ যোগ এতে হয় তাহলে তা কত বড় গুনার কাজ বলে গণ্য হবে তা তো বলাই বাহুল্য। 

হে আল্লাহ, আপনি স্বীয় হাবিবের সঙ্গী ও পরিবারবর্গের ওপর সন্তুষ্ট হোন এবং তাদেরকেও সন্তুষ্ট করে দিন। করুণাময়, আপনি আমাদেরকে সেসব লোকের মাঝে অন্তর্ভুক্ত করুন যারা তাঁদের সম্মান করেছেন। আমাদের হাশর করুন আপনি তাঁদের সঙ্গে। 

লেখক :   আলী হাসান তৈয়ব
সম্পাদনা : ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী 
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব
আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!

Post a Comment

0 Comments