কেমন করে সাজাবেন রামাদানের দৈনিক রুটিন?


রমাদান রুটিন আর রমাদান প্ল্যান- আমার কাছে দু'টো দুই ব্যাপার মনে হয়৷ রুটিনে সবকিছু টাইম টু টাইম লেখা থাকে। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় এরকম রুটিন মেইনটেইন করা কষ্টকর৷ কারণ সবদিন সমান থাকে না৷ আপনার একদিন ইফতারির পর ব্ল্যাক কফি খেতে ইচ্ছা করেছে, খেলেন, তারপর রাতে ঘুম আসলো না। অথচ রুটিনে আছে ঘুমাতে হবে। এই ঘুমটা সকালে ঘুমাতে চাইলে আবার রুটিনে সকালে অনেকক্ষণ ঘুমানোর অপশন নেই।

আবার প্রত্যেকেরই কিছু নিজস্ব কাজ থাকে। অনেকের schedule ই দিনে রাতে বদলায়। সে হয়তো এ জায়গাটায় হীনম্মন্য হতে পারে যে আমাকে দিয়ে তো রুটিন মানা হচ্ছে না। তখন অন্য আমলও ছুটতে থাকে, ধুর আমি তো মানতেই পারিনাই রুটিন।

আর এ ব্যাপারটা মাথার মধ্যে চাপ তৈরী করে, ড্রাম বাজতে থাকে ভেতরে- হচ্ছে না, হচ্ছে না, আমাকে দিয়ে হচ্ছে না।

সেজন্য নিজের কাজগুলো নিজেই গুছিয়ে ফেলার অভ্যাস করতে পারলে ভালো। তবে হ্যাঁ, নিজের জন্য করা নিজের রুটিনে কিছু বিষয় যেন অবশ্যই থাকে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। আমি সেই ব্যাপারগুলো একটু সামনে আনার চেষ্টা করি-

সবার আগে মনে রাখতে হবে, যে কোনো স্কেলে, পজিটিভ ও নেগেটিভের মাঝখানে একটা পয়েন্ট থাকে, নিউট্রাল পয়েন্ট। আপনি হয়তো প্রচুর আমল করছেন, ভালো কাজ করছেন, কিন্তু সাথে আপনার দ্বারা বেশ গুনাহও হয়ে যাচ্ছে। ফুটো বালতি। আসলে বালতি সবারটাই ফুটো প্রায়। তবে এই ফুটোর পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। যাতে বেরিয়ে যাওয়ার পানির পরিমাণ মিনিমাম করা যায়।

তাই, মোস্ট ইম্পোর্টেন্টলি, আমাদের নিজেদেরকে অন্তত নিউট্রাল স্টেটে নিতে হবে। গুনাহ কমিয়ে ফেলা। সাথে ভালো আমলের পরিমাণ বাড়ানো। গুনাহ যেন আমাদের ভালো আমলগুলো নষ্ট করে না দিতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতেই হবে।

এর জন্য প্রয়োজন, নিজের গুনাহের লিস্ট করা; একটা একটা করে ছেড়ে দেওয়া, কালকে না, আজকেই ছেড়ে দেওয়া; প্রত্যেকটা কাজের আগে ভেবে ভেবে করা। মুভি, সিরিজ দেখা ছেড়ে দেওয়া এই লকডাউনের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখন এসব দেখার অপশন বেশী, তাই গুনাহ করা সহজ।
গীবত করা ছেড়ে দেওয়া। এই ধরণের ব্যাপারগুলো।

আচ্ছা গুনাহ তো ছাড়লেন, তারপর? তারপর সবসময় আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ার অভ্যাস করতে থাকা। এর দু'টা উপকারিতা,

• গুনাহের পাপ থেকে মুক্তি।
• দু'আ কবুল।

কিছু গুনাহ ছাড়া খুব কঠিন হয়। অনেক দিনের অভ্যাস। সেগুলোর জন্য আল্লাহকে সবসময় বলতে থাকা, দু'আ করা, "আল্লাহ, আমাকে গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখেন, আমি নিজেকে বাঁচাতে পারছি না, আপনি আমাকে বাঁচিয়ে দিন। আমাকে আমার কন্ট্রোলে ছেড়ে দিয়েন না।"

রমাদানে বিগত গুনাহের জন্য তওবা করা। তওবা যেন এরকম হয়, ঐ গুনাহ করার কোনো ইচ্ছাই আর না থাকে।

রমাদানে শেষরাতে তো জাগাই হয়, তখন অনেক বেশী বেশী করে ইস্তিগফার করা। এটা খুব খুব খুব বেশী ইম্পোর্টেন্ট।

অনেক আগে একটা খুব সুন্দর টুইট চোখে পড়েছিলো- যদি তুমি আল্লাহর সাথে কথা বলতে চাও, তাহলে নামাজ পড়ো। আর যদি চাও আল্লাহ তোমার সাথে কথা বলুক, তাহলে কুরআন পড়ো।

রমাদানে তিলাওয়াত এবং কুরআন বুঝার চেষ্টা করা, দু'টোই করুন। প্রতিদিন কমপক্ষে এক পারা তিলাওয়াতের চেষ্টা করুন।
রোজায় অনেকেই জেগে থাকেন রাতে। রাতেরবেলা ফোনের স্ক্রিনের আলোতে আপনার চেহারা গ্লো করছে, এই দৃশ্যের চেয়ে আপনি গভীর মনোযোগে কুরআন বুঝার চেষ্টা করছেন, এমন দৃশ্য কতো বেশী সুন্দর!

রমাদান কুরআনের মাস। তিলাওয়াত ইজ রিয়েল রিয়েল ভেরি ইম্পোর্টেন্ট।

হিসনুল মুসলিম থেকে সকাল বিকালের ২৩ প্রকার যিকির দেখতে পারেন। এই পোস্ট দেখার পর একটু চোখ বুলিয়ে আসুন, আসলে কীসের কথা বলেছি। ওখানে যেসব উপকারিতা লেখা আছে প্রত্যেকটা যিকিরের শেষে, সেগুলো দেখে নিন একটু।

কারো সাথে আপনার ঝামেলা থাকলে মিটিয়ে ফেলুন। সালাম দেওয়া, একটু সুন্দর করে কথা বলা, সরি বলার থাকলে বলে ফেলা- এ-ই তো, বেশী কিছু না।

কারো সাথে তর্ক-বিতর্কে না জড়ানো। কোনোকিছু আপনার পছন্দ হয়নি, তো ইন্সট্যান্ড জ্বলে উঠার প্রয়োজন নেই। ঠান্ডা মাথায় ভাবুন, তারপর বুঝিয়ে বলুন। ফেইসবুকে অন্যের আচরণ নিয়ে জ্বালাময়ী বক্তব্যের দরকার নাই। অন্যের আচরণ আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, অতএব স্কিপ করুন। মতামতের ভিন্নতা, অন্যের বিরূপ মন্তব্য সহজভাবে নিন।

এগুলো কীভাবে রমাদান প্ল্যানের অংশ হচ্ছে, এ প্রশ্ন আপনার মাথায় আসতেই পারে। উত্তর হলো- রমাদানের পরের আমি যেন বেটার আমি হই। তাই এগুলো রমাদান প্ল্যানের অংশ।

লকডাউনে মানুষ অর্থাভাবে পড়ছে৷ আপনি হয়তো জানেনও না আপনি যখন খাচ্ছেন ঠিক তখন আরো কতো মানুষ খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে। হয়তো আপনি ডাল-ভাত খাচ্ছেন, অনেকে সেটাও পাচ্ছে না। WHO ইতোমধ্যে বলেছেই মধ্যপ্রাচ্যে অনেক অনেক শিশু দুর্ভিক্ষে পড়তে পারে এই পরিস্থিতির প্রভাবে৷ তাই যখনই আল্লাহ আপনার সামনে রিজিক হাজির করছেন,

— বিসমিল্লাহ বলে খান, দুআ পড়ে খান।
— খাওয়ার মাঝে মাঝে 'আল্লাহুম্মা লাকাল হামদ ওয়া লাকাশ শুকর' পড়ুন।
— খাওয়া শেষ শুকরিয়া করে দু'আ পড়ুন।

Seeds of guidance, Islamic selfhelp ওয়েবসাইটগুলোয় রমাদান নিয়ে ফ্রি কোর্স হচ্ছে, সেগুলো করতে পারেন। IOU এই কোভিড-১৯ ক্রাইসিসে তাদের ডিপ্লোমা কোর্স ফ্রি করে দিয়েছে। সেটাতেও এনরোল করে পড়াশুনা করতে পারেন।

দু'টো পয়েন্ট মাথায় রাখতে হবে সবসময়-

আল্লাহ কুরআনে আমাকে কী কী বলেছেন তার সবটা না জেনে, না বুঝে যেন আমরা মারা না যাই।

যতোটুকু ইসলামি জ্ঞান অর্জন করা আমার জন্য ফরজ, তা যেন অবশ্যই জানা হয়।

পড়ুন। এখন পড়াশুনার অফুরন্ত সুযোগ। শুধু ভেবে দেখুন, স্মার্টফোনটা হাতে না থাকলে আজকের আপনি আরো কতোকিছু করতে পারতেন।

অনস্ক্রিন টাইম কমানো। আমি বলছি না ফোনে ভালো কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ফোন ভালো কাজের ব্যাপারে মনকে বিক্ষিপ্ত করে দেয়। আপনি হয়তো ফেইসবুকে ঢুকবেন নির্দিষ্ট কোনো কাজে, কিন্তু চোখ সেই একটা কাজে আটকে থাকে না। অনেকরকম কন্টেন্ট, অনেক পোস্ট ভিডিওর জ্যামে আপনার মনোযোগ নষ্ট হয়ে যায়। এই রোজা থেকেই তাই অনস্ক্রিন টাইম কমানো শুরু হোক। কীভাবে কমানো যায় এ নিয়ে আরেকটা পোস্টে লেখার চেষ্টা করবো। তবে আপাতত একটা পয়েন্ট বলি, দিনে, আপনি জেগে আছেন, এমন টানা চার ঘণ্টা ফোন ব্যবহার না করে থাকেন।

এইসব ব্যাপার মাথায় রেখে নিজের দিনলিপি নিজেই গুছিয়ে নিন। আর হ্যাঁ, মনে রাখতে হবে-

— রুটিন যেন হিজিবিজি না হয়। Never cram your routine. Keep space for you.

— একদিনে ১০০ পৃষ্ঠা পড়া রুটিনে ঢুকালে সেটা আপনার জন্য প্রায়দিনই সম্ভব হবে না। কিন্তু ৫ বা ১০ পৃষ্ঠা রাখলে আপনি আপনার টার্গেট ফিলআপ করতে পারেন। ফিলআপ করতে পারার যে আনন্দানুভূতি, তা আপনাকে পরেরদিনও উৎসাহ দিবে ইনশাআল্লাহ।

— তারপরও, সবদিন সমান যায় না, নাইট শিফটে কাজ করলে সারাদিন প্রোডাক্টিভ থাকা কষ্টকর। অথবা কোনোদিন রুটিন মানতে ভালো না-ও লাগতে পারে। সারাদিন প্রোডাক্টিভ থাকলেও রুটিন ১০০% মানা হবে না এটা ধরেই রাখেন। পারসেন্টেজটা যেন ইনক্রিজিং থাকে সেদিকে ফোকাসড থাকুন।

আপনার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।
মুনাজাতে স্মরণ রাখার অনুরোধ।

লেখাঃ নাবিলা আফরোজ জান্নাত (আল্লাহ্‌ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!)

আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!

Post a comment

0 Comments