রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর মু‘জিযা – হাদিসের গল্প

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর মু‘জিযা – হাদিসের গল্প

সংকলন ও প্রকাশনায় :
 আওয়ার ইসলাম বিডি টিম
মুজাহিদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আবূ হুরায়রা (রা:) বলতেন, আল্লাহ্‌র কসম, যিনি ছাড়া কোন (হক) ইলাহ নেই। আমি ক্ষুধার যন্ত্রণায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকতাম।আর কখনও পেটে পাথর বেঁধে রাখতাম। একদা আমি তাঁদের (রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং ছাহাবীদের) রাস্তায় বসেছিলাম, যেখান দিয়ে তারা বের হ’তেন। আবূ বকর (রা:) রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম।আমি এ উদ্দেশ্যেই তা করলাম, যেন তিনি আমাকে কিছু খেতে দিয়ে পরিতৃপ্ত করেন। কিন্তু তিনি চলে গেলেন, কিছুই করলেন না। এরপর ওমর (রা:) আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁকেও সেই একই উদ্দেশ্যে কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। কিন্তু তিনিও চলে গেলেন, কিছুই করলেন না।
অতঃপর আবুল কাসেম [অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)] আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, আমাকে দেখে তিনি মুচকি হাসলেন। তিনি আমার চেহারা দেখে মনের কথা বুঝতে পারলেন এবং বললেন, ‘হে আবূ হুরায়রা (রা:)! আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ্‌র  রাসূল (সাঃ)! আমি উপস্থিত। তিনি বললেন, ‘তুমি আমার সঙ্গে চল’! অতঃপর তিনি চললেন, আমি তাঁর অনুসরণ করলাম। তিনি বাড়ীতে প্রবেশ করলেন। অতঃপর আমি ভিতরে  প্রবেশের অনুমতি চাইলাম। তিনি অনুমতি দিলে আমি প্রবেশ করলাম। তিনি ঘরে প্রবেশ করে একটি পেয়ালায় কিছু দুধ দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ দুধ কোথা থেকে এসেছে’?বাড়ির লোকজন উত্তর দিল, ‘অমুক পুরুষ অথবা অমুক মহিলা আপনার জন্য হাদিয়াস্বরূপ দিয়েছে’। তিনি বললেন, ‘হে আবূ হুরায়রা (রা:)’! আমি বললাম, ‘আমি হাযির হে আল্লাহ্‌র  রাসূল’! তিনি বললেন, ‘আহলে ছুফ্ফার লোকদেরকে গিয়ে এখানে ডেকে আন’।
(রাবী বলেন) ‘আহলে ছুফফা’ ছিল ইসলামের মেহমান। তাদের পরিবার- পরিজন, ধন-সম্পদ কিছুই ছিল না। আর এমন কেউ ছিল না, যার উপর ভরসা করা যায়। যখন কোন ছাদাকার মাল রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট আসত, তখন তিনি তাদের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। নিজে সেখান থেকে কিছুই গ্রহণ করতেন না। আর যদি কোন হাদিয়া (উপঢৌকন) আসত, তিনি সেখান থেকেও এক অংশ  তাদের জন্য পাঠিয়ে দিয়ে এতে তাদেরকে শরীক করতেন এবং নিজে এক অংশ  গ্রহণ করতেন। (আবু হুরায়রা বলেন) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর আদেশ শুনে আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। (মনে মনে) বললাম, এতটুকু দুধ দ্বারা ‘আহলে ছুফফা’র কি হবে? আমিই এ দুধ পানের বেশী হকদার। আমি তা পান করলে আমার শরীরে শক্তি ফিরে পেতাম। যখন তারা এসে গেলেন, তখন তিনি আমাকে আদেশ দিলেন, আমিই যেন তাদেরকে দুধ পান করতে দেই। আর আমার আশা রইল না যে, এ দুধ থেকে আমি কিছু পাব।
কিন্তু আল্লাহ্‌ ও তার রাসূল (সাঃ)-এর আদেশ মান্য করা ছাড়া আমার কোন গত্যন্তর ছিল না।সুতরাং আমি ‘আহলে ছুফ্ফার নিকট গিয়ে তাদেরকে ডেকে আনলাম’। তারা এসে (ঘরে প্রবেশের) অনুমতি চাইলে তিনি তাদেরকে অনুমতি দিলেন। তারা ঘরে এসে নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন। তিনি বললেন, হে আবূ হুরায়রা! আমি বললাম, আমি হাযির হে আল্লাহ্‌র রাসূল! রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে বললেন, এটি তাদেরকে দাও। আমি (দুধের) পেয়ালা হাতে নিয়ে দিতে শুরু করলাম। এক ব্যক্তির হাতে দিলাম, সে পান করে পরিতপ্তৃ হ’ল এবং আমাকে পেয়ালা ফেরত দিল।
অতঃপর আমি অন্য একজনকে দিলাম, সেও তৃপ্তি সহকারে পান করে পেয়ালা ফেরত দিল। তৃতীয় জনকে দিলে সেও তাই করল। এভাবে আমি (সর্বশেষে) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট পৌছলাম। সবাই পরিতৃপ্ত হ’ল। তিনি পেয়ালা নিলেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ‘হে আবূ হুরায়রা’! আমি বললাম, ‘আমি হাযির হে আল্লাহ্‌র রাসূল’! তিনি বললেন, ‘এখন আমি আর তুমি বাকী’। আমি বললাম, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন হে আল্লাহ্‌র রাসূল’। তিনি বললেন, ‘বসে পড় এবং পান কর’। আমি বসে পান করলাম। তিনি (পুনরায়) বললেন, ‘পান কর’। আমি পান করলাম। তিনি একথা বলতেই থাকলেন, অবশেষে আমি বলতে বাধ্য হ’লাম যে, ‘আল্লাহ্‌র শপথ! যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, আমার পেটে আর জায়গা নেই’। তিনি বললেন, ‘তাহলে আমাকে দাও’। আমি তাঁকে দিলে তিনি আল্লাহ্‌র প্রশংসা করলেন এবং বিসমিল্লাহ বলে বাকী দুধ পান করলেন (ছহীহ বুখারী হা/৬৪৫২, ‘রিকাক’অধ্যায়, অনুচেছদ-১৭, মিশকাত হা/৪৬৭০ ‘শিষ্টাচার’অধ্যায়, ‘অনুমতি’অনুচেছদ)।

শিক্ষা:

১.  রাসূল (সাঃ) ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ। তিনি তাঁর ছাহাবীদের মুখ দেখেই তাদের অন্তরের অবস্থা বুঝতে পারতেন।
২.  বসে পান করা সুন্নত।
৩. বিসমিল্লাহ বলে পান করতে হবে।
৪.  আমন্ত্রিত ব্যক্তি অনুমতি না নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করবে না।
৫. পরস্পর ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধির জন্য হাদিয়া বা উপঢৌকন প্রদান করা সুন্নত।
৬.  বিপদগ্রস্ত বা অভাবগ্রস্তে ক সাহায্য করা মুমিনের অবশ্য কর্তব্য।

পরকীয়ার শাস্তি দুনিয়াতে ও আখিরাতে ৬টি

রহমান রহীম আল্লাহ্ তায়ালার নামে-



দিনেদিনে আমাদের সমাজে মহামারী আকার ধারণ করেছে পরকীয়া। আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে পারিবারিক কলহ। এই পরকীয়ার করণে প্রতিদিনই স্বামীর হাতে স্ত্রী, স্ত্রীর হাতে স্বামী, সন্তানের হাতে পিতা-মাতা এবং পিতা-মাতার হাতে সন্তানের প্রাণ হরণের মত ঘটনা ঘটছে। বাড়ছে পারিবারিক অশান্তি, ভেঙে যাচ্ছে সংসার। এর শেষ পরিণতি হচ্ছে নৃশংস ঘটনার মধ্য দিয়ে।
আমাদের সমাজে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে পরকীয়া। পত্রিকার পাতা খুলতেই চোখে পড়ে পরকীয়ার খবর। পরকীয়ার ফাঁদে আটকা পড়ে আত্মহনন করছেন অগণিত নারী-পুরুষ, বলি হচ্ছেন নিরপরাধ সন্তান, স্বামী অথবা স্ত্রী। পরকীয়ার পথে বাধা হওয়ায় নিজ সন্তানকেও নির্মমভাবে হত্যা করছে মমতাময়ী মা।
ইসলাম একটি মানবিক ধর্ম। সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন বিধান। কোনো মানবিক গর্হিত কাজকে ইসলাম অনুমোদন দেয়নি।
বিবাহিত কোন নারী বা পুরুষ স্বীয় স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে কোনো ধরণের সর্ম্পক কিংবা বিবাহবহির্ভূত প্রেম, যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার মত গর্হিত কর্মকে কীভাবে ইসলাম সমর্থন করতে পারে?
এ বিকৃত কর্মের অসারতা বিবেকও ধিক্কার দেয়। নিজ স্বামী বা স্ত্রী অন্য কারো সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করবে, সুস্থ বিবেকবান কোনো মানুষ এটা মেনে নিতে পারে না। এ কর্মের কারণে সমাজ যেমন শৃঙ্খলতা হারায়, তেমনি পারিবারিক বন্ধনেও ধরে ফাটল। পর্যুদুস্ত হয়ে পড়ে সামাজিক সকল রীতিনীতি।
এ কাজের বিষফল মানবাজাতি কয়েক যুগ ধরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষ্য করে আসছে। ইসলাম হলো নীতি ও আদর্শের ধর্ম। ইসলামে পরকীয়া ও অবৈধ সম্পর্ক থেকে নারী-পুরুষকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
নারীদের কথার আওয়াজকেও সতরের অন্তর্ভুক্ত করে অপ্রয়োজনে পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। একান্ত প্রয়োজনে কথা বলতে হলেও সুরা আহজাবের ৩২ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পরপুরুষের সঙ্গে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। যাতে নারীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কোনো পুরুষ আকর্ষণবোধ না করেন।
শুধু নারীদেরই নয়, বরং সুরা নুরের ৩০ নম্বর আয়াতে প্রথমে আল্লাহ তায়ালা পুরুষদেরকে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর ৩১ নম্বর আয়াতে মহিলাদেরকে তাদের দৃষ্টি সংযত রাখার পাশাপাশি তাদের গোপন শোভা অনাবৃত করতে নিষেধ করা হয়েছে।
অপাত্রে সৌন্দর্য প্রদর্শনকে হারাম করে সবটুকু সৌন্দর্য স্বামীর জন্য নিবেদনে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। কারণ, স্বামী তার স্ত্রীর সৌন্দর্যে মোহিত হলে সংসারের শান্তিই বাড়বে। পক্ষান্তরে স্ত্রীর সৌন্দর্য দিয়ে অন্যকে মোহিত করার পথ অবারিত করলে তা কেবল বিপদই ডেকে আনবে।
পুরুষ-মহিলা সবাইকে চরিত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। এটা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট আচরণ।’ (সুরা বনি ইসরাইল, ৩২)
ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ বলেন, ‘ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী উভয়কে এক’শ ঘা করে বেত্রাঘাত কর।’ (সুরা নুর- ২)
হাদিস শরিফে ব্যভিচারের ভয়ানক শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হে মুসলমানগণ! তোমরা ব্যভিচার পরিত্যাগ কর। কেননা এর ছয়টি শাস্তি রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখেরাতে প্রকাশ পাবে।
যে তিনটি শাস্তি দুনিয়াতে হয় তা হচ্ছে, 
১. তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য বিনষ্ট হয়ে যাবে, 
২. তার আয়ুষ্কাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে এবং 
৩. তার দারিদ্রতা চিরস্থায়ী হবে। 
আর যে তিনটি শাস্তি আখেরাতে প্রকাশ পাবে তা হচ্ছে, 
১. সে আল্লাহর অসন্তোষ, 
২. কঠিন হিসাব ও 
৩. জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে।’ (বায়হাকি, হা নং ৫৬৪)
হজরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুখ ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের জামিনদার হবে আমি তার বেহেশতের জামিনদার হবো।’ (বুখারিঃ ৭৬৫৮)
যিনাকারীর পরকালীন শাস্তি:
যিনাকারীর পরকালীন শাস্তি বর্ণনায় হাদীস শরীফে এসেছে, ‘যিনারাকীরা উলংগ অবস্থায় এমন এক চুলার মধ্যে থাকবে যার অগ্রভাগ হবে অত্যন্ত সংকীর্ণ আর নিম্নভাগ হবে প্রশস্ত উহার তলদেশে অগ্নি প্রজ্বলিত থাকবে তাদেরকে তাতে দগ্ধ করা হবে। তারা মাঝে মধ্যে সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার কাছাকাছি অবস্থায় পৌছে যাবে। অত:পর আগুন যখন স্তমিত হয়ে যাবে তখন তাতে তারা আবার ফিরে যাবে। আর তাদের সাথে এই আচারণ কেয়ামত পর্যন্ত করা হবে।’ (বুখারী)
কখনো দেখা যায় দেবরের সাথে জমে ওঠে পরকীয়া। ইসলাম দেবরের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করার লাগামকেও টেনে ধরেছে। হজরত উকবা ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সাবধান! তোমরা নির্জনে নারীদের কাছেও যেও না।’ এক আনসার সাহাবি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! দেবর সম্পর্কে আপনার নির্দেশ কী? নবীজি (সা.) বললেন, ‘দেবর তো মৃত্যুর সমতুল্য।’ (মুসলিম, ২৪৪৫)
হাদিসের ব্যাখ্যায় হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. ফতহুল বারিতে লিখেছেন, ‘এখানে মৃত্যুর সমতুল্যর অর্থ হলো হারাম।’ আর ইসলামে এসবের শাস্তি ভয়াবহ। এসবের শাস্তি হিসেবে রজম ও দোররার নির্দেশ এসেছে হাদিসে। যাতে কোনো নারী ও পুরুষ যেন এধরনের ভয়াবহ কর্মে লিপ্ত না হয়।

উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য জুম’আর দিনের ফযীলত সমূহ

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

লেখকঃ অধ্যাপক মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম
জুম’আর নামাজের ফযীলত ও তা আদায়কারীদের জন্য ঘোষিত পুরষ্কার-

 ১। কুরবানী করার সমান সওয়াব অর্জিত হয়ঃ

দিনে আগে ভাগে মসজিদে গেলে দান-খয়রাত বা পশু কুরবানী করার সমতুল্য সওয়াব পাওয়া যায়। আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত এক হাদীসে রাসুল (সাঃ) বলেছেন,
 “যে ব্যাক্তি জু’আর দিন ফরজ গোসলের মত গোসল করে প্রথম দিকে মসজিদে হাজির হয়, সে যেন একটি উট কুরবানী করল, দ্বিতীয় সময়ে যে ব্যাক্তি মসজিদে প্রবেশ করে সে যেন একটি গরু কুরবানী করল, তৃতীয় সময়ে যে ব্যাক্তি মসজিদে প্রবেশ করল সে যেন একটি ছাগল কুরবানী করল। অতঃপর চতুর্থ সময়ে যে ব্যাক্তি মসজিদে গেল সে যেন একটি মুরগী কুরবানী করল। আর পঞ্চম সময়ে যে ব্যাক্তি মসজিদে প্রবেশ করল সে যেন একটি ডিম কুরবানী করল। অতঃপর ইমাম যখন বেরিয়ে এসে মিম্বরে বসে গেলেন খুৎবার জন্য, তখন ফেরেশতারা লেখা বন্ধ করে খুৎবা শুনতে বসে যায়।” (বুখারীঃ ৮৮১, ইফা ৮৩৭, আধুনিক ৮৩০)

২। মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে ফেরেশতারা অগ্রগামীদের নাম তালিকাভুক্ত করেনঃ

জুম’আর সালাতে কারা অগ্রগামী, ফেরেশতারা এর তালিকা তৈরি করে থাকেন। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,
“জুম’আর দিন মসজিদের দরজায় ফেরেশতা এসে হাজির হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে তারা সর্বাগ্রে আগমনকারীদের নাম লিখতে থাকে। প্রথম ভাগে যারা মসজিদে ঢুকেন তাদের জন্য উট, দ্বিতীয়বারে যারা আসেন তাদের জন্য গরু, তৃতীয়বারে যারা আসেন তাদের জন্য ছাগল, চতুর্থবারে যারা আসেন তাদের জন্য মুরগী, ও সর্বশেষ পঞ্চমবারে যারা আগমন করেন তাদের জন্য ডিম কুরবানী বা দান করার সমান সওাব্ব লিখে থাকেন। আর যখন ইমাম খুৎবা দেওয়ার জন্য মিম্বরে উঠে পড়েন ফেরেশতারা তাদের এ খাতা বন্ধ করে খুৎবা শুনতে বসে যান।” (বুখারী ৯২৯, ইফা ৮৮২, আধুনিক ৮৭৬)

৩। দশ দিনের গুনাহ মাফ হয়ঃ

জুম’আর দিনের আদব যারা রক্ষা করে তাদের দশ দিনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,
‘যে ব্যাক্তি ভালভাবে পবিত্র হল অতঃপর মসজিদে এলো, মনোযোগ দিয়ে খুৎবা শুনতে চুপচাপ বসে রইল, তার জন্য দুই জুম’আর মধ্যবর্তী এ সাত দিনের সাথে আরও তিনদিন যোগ করে মোট দশ দিনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে খুৎবার সময় যে ব্যক্তি পাথর, নুড়িকণা বা অন্য কিছু নাড়াচাড়া করল সে যেন অনর্থক কাজ করল।’ (মুসলিমঃ ৮৫৭)

৪। জুম’আর আদব রক্ষাকারীর দশ দিনের গুনাহ মুছে যায়ঃ

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,
“জুম’আর সালাতে তিন ধরনের লোক হাজির হয়। (ক) এক ধরনের লোক আছে যারা মসজিদে প্রবেশের পর তামাশা করে, তারা বিনিময়ে তামাশা ছাড়া কিছুই পাবে না। (খ) দ্বিতীয় আরেক ধরনের লোক আছে যারা জুম’আয় হাজির হয় সেখানে দু’আ মুনাজাত করে, ফলে আল্লাহ যাকে চান তাকে কিছু দেন আর যাকে ইচ্ছা দেন না। (গ) তৃতীয় প্রকার লোক হল যারা জুম’আয় হাজির হয়, চুপচাপ থাকে, মনোযোগ দিয়ে খুৎবা শোনে, কারও ঘাড় ডিঙ্গিয়ে সামনে আগায় না, কাউকে কষ্ট দেয় না, তার দুই জুম’আর মধ্যবর্তী ৭ দিন সহ আরও তিনদিন যোগ করে মোট দশ দিনের গুনাহ খাতা আল্লাহ তায়ালা মাফ করে দেন।” (আবু দাউদঃ ১১১৩)

৫। প্রতি পদক্ষেপে এক বছরের নফল রোজা ও এক বছরের সারারাত তাহাজ্জুদ পড়ার সওয়াব অর্জিত হয়ঃ

যে ব্যাক্তি আদব রক্ষা করে জুম’আর সালাত আদায় করে তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে তার জন্য পুরো এক বছরের রোজা পালন এবং রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়ার সওয়াব লিখা হয়।
আউস বিন আউস আস সাকাফী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,
“জুমা’আর দিন যে ব্যাক্তি গোসল করায় (অর্থাৎ সহবাস করে, ফলে স্ত্রী ফরজ গোসল করে এবং) নিজেও ফরজ গোসল করে, পূর্বাহ্ণে মসজিদে আগমন করে এবং নিজেও প্রথম ভাগে মসজিদে গমন করে, পায়ে হেঁটে মসজিদে যায় (অর্থাৎ কোন কিছুতে আরোহণ করে নয়), ইমামের কাছাকাছি গিয়ে বসে, মনোযোগ দিয়ে খুৎবা শোনে, কোন কিছু নিয়ে খেল তামাশা করে না; সে ব্যাক্তির প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য রয়েছে বছরব্যাপী রোজা পালন ও সারা বছর রাত জেগে ইবাদত করার সমতুল্য সওয়াব।” (মুসনাদে আহমাদঃ ৬৯৫৪, ১৬২১৮)

৬। দুই জুম’আর মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহের কাফফারাঃ

জুম’আর সালাত জুম’আ আদায়কারীদের জন্য দুই জুম’আর মধ্যবর্তী গুনাহের কাফফারা স্বরূপ। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,
“পাঁচ বেলা সালাত আদায়, এক জুম’আ থেকে পরবর্তী জুম’আ, এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজানের মধ্যবর্তী সময়ে হয়ে যাওয়া সকল (সগীরা) গুনাহের কাফফারা স্বরূপ, এই শর্তে যে, বান্দা কবীরা গুনাহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে।” (মুসলিমঃ ২৩৩)

সূত্রঃ বই-প্রশ্নোত্তরে জুমু’আ ও খুৎবা
পরিমার্জনেঃ ডঃ মোহাম্মদ মনজুরে ইলাহী,
ডঃ আবু বকর মুহাম্মদ জাকারিয়া মজুমদার,
ডঃ মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ।

মাদরাসাতুল মারওয়াহ’ সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত

রহমান রহীম আল্লাহ্ তায়ালার নামে-


মাদরাসাতুল মারওয়াহ্ 
 কোরআনের আদর্শ মানুষ গড়ার লক্ষ্যে

প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক: মাঈনুদ্দীন ওয়াদুদ | 
আজ বৃহস্পতিবার সকাল নয়টায় ২১শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আমাদের মাদরাসাতুল মারওয়াহ’র উদ্যোগে মিরপুরস্থ মারওয়াহ মিলনায়তনে এক মনোমুগ্ধকর সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা ও দোয়া আর আয়োজন করা হয়।

মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মাঈনুদ্দীন ওয়াদুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাট মন্ত্রনালয়ের বিশিষ্ট কর্মকর্তা জনাব মু জাকারিয়া, ও হাফেজ মাও. হাসান মাহমুদ।

সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতায় বিজয়ী তিনজনকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কার বিতরণ শেষে মনোজ্ঞ হামদ-নাত গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে মারওয়াহ’র ক্ষুদে ছাত্ররা। সবশেষে ভাষা শহীদদের জন্য দোয়া আর মাধ্যমে অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘটে।

কিছু ছবি দেওয়া হলো দেখুন:









সবাই দোয়া করবেন আমাদের মাদরাসাতুল মারওয়াহ’ জন্য। ধন্যবাদ পোস্ট দেখা ও পড়ার জন্য

মাতৃভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে ইসলাম : একটি পর্যালোচনা


রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-
লেখক: মুহাম্মদ শাহিদুল ইসলাম
(সহকারী অধ্যাপকইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ঢাকা)

বাংলা ১৩৫৯ সালের ৮ ফাল্গুন। যা আজ ৬৭ বছর ধরে এ দেশ মাতৃকায় একুশে ফেব্রুয়ারি নামে ভাষা আন্দোলনের স্মরণ দিবস হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও গাম্ভীর্যের সাথে উদযাপিত হয়ে আসছে। ১৯৯৯ সাল থেকে এ দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। মাতৃভাষা ব্যবহার এবং তার মর্যাদা রক্ষার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আন্দোলন হয়েছে এবং হচ্ছে। যথা তুরস্ক, বুলগেরিয়া, মধ্যএশিয়ার অঞ্চলসমূহ এবং ভারতের উত্তর প্রদেশ কিন্তু ভাষার জন্য রক্তদান বা নিহত হওয়ার ঘটনা বেল বাংলাদেশেই ঘটেছে। মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার দীপ্ত শপথ নিয়ে বাংলার কিছু অকুতোভয় বীর সন্তান নিজেদের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে রচনা করে এক সূর্যস্নাত রক্তিম ইতিহাস। যা ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্যকে আরো গভীরে নিয়ে গেছে। অথচ এখানে একটি প্রশ্ন প্রায়ই অনেকের মনে দোলা দেয়, একটি ভাষা নিয়ে সমাজ পরিবেশ এতো উত্তেজিত করা বা আন্দোলনে যাওয়া এদেশবাসী মুসলিম হিসেবে ইসলামের দৃষ্টিতে কতটুকু মাননাসই? ইসলাম কি কোন ভাষার উৎকর্ষ সাধনের জন্য আন্দোলন চালাতে এসেছে? ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে ইসলামের ভূমিকা কী? এ নিয়ে অত্র আলোচনার অবতারণা।

ভাষা শব্দের অর্থ

মনের ভাব প্রকাশের ভঙ্গিই ভাষা। তা কণ্ঠধ্বনির মাধ্যমে হোক বা অন্য কোন অঙ্গ প্রত্যঙ্গর ইশারার মাধ্যমে হোক। ভাষার সংজ্ঞা প্রদানে ড. রামেশ্বর বলেন : ‘‘মানুষের বাকযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত কতকগুলো ধ্বনিগত ভাব সংকেত বা প্রতীক সমষ্টির নাম।’’[1]
ভাষার সংজ্ঞা প্রদানে Henry Sweet বলেন : “Language is the expression of ideas by means of speech-sounds combined into words. Words are combined into sentences, this combination answering to that of ideas into thoughts.[2]
ভাষাবিজ্ঞানী Edgar. H. Sturtevant বলেন : “A language is a system of arbitrary vocal symbols by which members of a social group Co-operate and interect.[3]
মানুষ সামজিক জীব। এজন্য তাকে অন্য মানুষের সাথে ভাব বিনিময় করতে হয়। এভাবে বিনিময়ের জন্য যে সব সংকেত প্রতীক ব্যবহৃত হয় তাই ভাষা, এভাবে বিশ্লেষণ করলে ভাষার চারটি মূল বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়: ক. এ কতগুলি ধ্বনির সমষ্টি, খ. এ ধ্বনি কণ্ঠনিঃসৃত, গ. এটি একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ ব্যবস্থা, ঘ. এ ধ্বনিগুলো বস্ত্ত বা ভাবের প্রতীক।[4]
ভাষার সংজ্ঞা প্রদানে আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ বলেন : ভাষা হচ্ছে মানুষের ভাব বিনিময় ও প্রকাশের প্রতীকী প্রত্যয় বিশেষ। এটি ধ্বনি ও ইশারা ও ইঙ্গিত উভয়কেই অন্তর্ভূক্ত করে। তবে পারিভাষিক অর্থে কারো কণ্ঠনিঃসৃত অর্থবোধক ধ্বনিকেই ভাষা নামে অভিহিত করা হয়।[5]

আন্দোলন শব্দের অর্থ

‘আন্দোলন’ শব্দটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘‘একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য প্রচার বা আলোচনা দ্বারা উত্তেজনা সৃষ্টিকরণকেই আন্দোলন বলে।[6] সুতরাং ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে ইসলামে ভূমিকা কী? তা নির্ভর করে ভাষা আন্দোলনের উদ্দেশ্যের উপর।

বাংলাভাষা আন্দোলনের উদ্দেশ্য

ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক ধারণা থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশের ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রথমত মূল উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভাষা ব্যবহার এবং তার সার্বিক উৎকর্ষ সাধন ও চর্চা করার অধিকার আদায় করা। এছাড়া পূর্ববর্তী রাজাদের বিভিন্ন যুগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, এটি বৌদ্ধ যুগের পর ব্রাক্ষ্মণ্যবাদী সেন রাজারা বাংলাভাষা চর্চা নিষিদ্ধ করেছিল। আর হিন্দু পুরোহিতরা এ কথা বলে বেড়াতো যে, যে ব্যক্তি বাংলাভাষায় কথা বলবে সে নরকে যাবে। তেমনি বৃটিশ ইংরেজরাও ইংরেজি ভাষা ও তাদের সংস্কৃতি এতদঞ্চলে চাপিয়ে দেয়ার চরম ষড়যন্ত্র করেছিল।[7] বাঙ্গালী মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ নির্বিশেষে সকল ধর্মের বুদ্ধিজীবীরা সে নিষেদাজ্ঞা এবং ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে বাংলাভাষায় বিবিধ সাহিত্য রচনা করে এ ভাষার ভান্ডার বিবিধ রতনে সমৃদ্ধ করেন। অতঃপর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের প্রাক্কালে তৎকালীন বিশ্বরাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে চীন ও রাশিয়ার স্টাইলে ভাষাগত ঐক্যের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য সুদঢ় করার লক্ষ্যে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী ও তাদের তোষণকারী অনুসারীরা উর্দূকে জাতীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল ভাষাতত্ত্বের এক ভুল ব্যাখ্যার ছত্রছায়ায়। তারই প্রতিবাদে বাংলাভাষা আন্দোলন নতুনরূপে বেগবান হয় মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য।[8]
বাংলাভাষার জন্য আন্দোলনের অপর একটি উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে অফিস আদালতসহ রাষ্ট্রের সর্বস্তরে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা, জাতীয় স্বকীয়তা ও পরিচিতি সারা বিশ্বে আরো উন্নত করা। এজন্য বাংলাভাষা আন্দোনের অন্যতম শ্লোগান ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।[9]
অপর একটি উদ্দেশ্য ছিল গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় করার জন্য ভাষা আন্দোলন। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মুখের ভাষা উপপেক্ষা করে অন্য একটি ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা চরম অন্যায়, তথা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। এ অন্যায়ের প্রতিরোধ করতে বাংলাভাষা আন্দোলন শুরু হয়। যে জন্য এটি অবশেষে এতদঞ্চলের অবহেলিত জনতার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সকল বৈষম্য দূরীকরণ তথা স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রূপ নেয়।

ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা

মানুষ তার শৈশবকাল থেকে কথা বলতে শিখলেও তার ভাষা শুদ্ধ হবে, এমন কাথা ঠিক নয়। কোন ভাষায় শুদ্ধ, প্রাঞ্জল ও সাবলীলভাবে কথা বলতে হলে, সাহিত্য তৈরী করতে হলে সে ভাষা চর্চা করতে হবে। এ জন্য পড়তে হবে, বিশেষ বিশেষ বক্তব্য আত্মস্থ করতে হবে, আবৃত্তি করতে হবে, ভাষাশৈলীর রহস্য জানতে হবে, অনুসরণ করতে হবে। তা হলেই একজন মানুষ বাগ্মী ও পরিশীলিত বক্তব্যের অধিকারী হতে পারে। ইসলাম মানুষের ভাষাকে বিভিন্নভাবে মর্যাদা ও গুরুত্ব দিয়েছে। আর তা হলো, মানুষ জন্মলগ্ন থেকে যে ভাষায় কথা বলে, বড় হয়ে উঠে, সে ভাষায় কথা বলার অধিকার তার জন্মগত অধিকার ও সহজাত প্রবৃত্তি। ফলে এটা তার অস্থিমজ্জা, রক্ত মাংসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত হয়ে যায়। তাই ইসলাম মানুসের এ অধিকার কেড়ে নেয় না। মায়ের প্রতি একটি সন্তানের আকর্ষণ যেমন স্বাভাবিক, কারো মাতৃভাষার প্রতি আকর্ষণও তেমনি স্বাভাবিক। স্বভাব ধর্ম ইসলাম মানুষের এ স্বাভাবিক আকর্ষন সহজেই স্বীকার করে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন :
فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ.
‘‘অতএব (হে নবী), তুমি নিষ্ঠার সাথে নিজেকে সঠিক দ্বীনের ওপর দৃঢ় রাখো, আল্লাহ্ তা‘আলার প্রকৃতির ওপর (নিজেকে দাঁড় করাও), যার ওপর তিনি মনুষকে পয়দা করেছে; (মনে রেখো) আল্লাহর সৃষ্টির মাঝে কোনো রদবদল নেই; এ হচ্ছে সহজ জীবনবিধান, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না।’’[10]
আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষের মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দিতে যেয়ে তাঁর প্রেরিত প্রত্যেক নবীকে স্বজাতির ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন এবং এ ভাষাতেই কিতাবাদি নাযিল করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন :
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ فَيُضِلُّ اللَّهُ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ.
‘‘আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য, আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’’[11] আর এ কারণেই আল-কুর’আন আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে।
ইসলাম মাতৃভাষা নিয়ে গর্ব অবৈধ মনে করে না বরং বর্ণিত আছে, রাসূল সা. মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়ের ভাষায় কথা বলতে গর্ববোধ করতেন। তিনি বলতেন : ‘‘আরবদের মধ্যে আমার ভাষা সর্বাধিক সুফলিত। তোমাদের চাইতেও আমার ভাষা অধিকতর মার্জিত ও সুফলিত।’’[12]
এর কারণ তিনি নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ‘‘আরবের সবচেয়ে মার্জিত ভাষার অধিকারী সাদিয়া গোত্রে আমি মানুষ হয়েছি। তাদেরই কোলে আমার মুখ ফুটেছে। তাই আমি সর্বাধিক সুফলিত ভাষা ব্যক্ত করেছি।’’[13]
কাজেই মাতৃভাষা নিয়ে গর্ব করা যায়। সকলেই মাতৃভাষা চর্চার, একে উন্নত করার অধিকার রয়েছে এবং এ লক্ষ্যে কাজ করা কর্তব্যও বটে। মূল আরবী ভাষা এক হলেও আরবদের গোত্রভেদে উচ্চারণ ও পঠনরীতির মাঝে কিছুটা পার্থক্য আছে। যাকে কেন্দ্র করে একই অর্থের বিভিন্ন শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয় যাকে আরবী পরিভাষায় মুরাদিফাত বলে।
যাহোক, আল-কুর’আন মূলত ভাষা ও উচ্চারণ রীতিকে প্রাধান্য দিয়েই অবতীর্ণ হয়। কিন্তু ইসলাম ভাষাগত আঞ্চলিকতা তথা মাতৃভাষা প্রতি এতই গুরুত্ব দিয়েছে যে, আল-কুর’আন আরবের বিভিন্ন পঠনরীতিতে পাঠ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ জন্য কুর’আন পাঠ সাত ক্বির’আত (পঠনরীতি) প্রচলিত আছে। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে,
قال رسول الله صلى الله عليه و سلم : إن القرآن أنزل على سبعة حروف فاقرؤوا ما تيسر منه.
‘‘রাসূল সা. বলেছেন : নিশ্চয়ই কুর’আন সাত হরফে বা উপভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। অতএব, এসকল ভাষার মধ্যে যে ভাষাটি (তোমাদের কাছে) সহজ হয়, সেভাষাতেই তোমরা তা পাঠ কর।’’[14]
মাতৃভাষার প্রতি আকর্ষণ ও ভালবাসা মাতৃভূমির প্রতি প্রেমের ন্যায় ঈমানের অঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হয়। মহানবী সা. বলেছেন :
حب الوطن من الإيمان.
‘‘মাতৃভূমির প্রতি ভালবাসা ঈমানের অঙ্গ।’’[15]
অতএব মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। উভয়টি মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণের অন্যতম উৎস। কেননা, মাতৃভাষা মানুষের পবিত্র এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। এ ভাষার মধ্যে মানুষ অংকুরিত হয়। এ ভাষার মধ্যে মানুষ সর্বদা প্রবাহিত থাকে। এ ভাষায় তাদের অস্তিত্ব স্বাক্ষরিত হয়।
ভাষা বিকৃতি করাও ইসলাম সমর্থন করে ন। কারণ, আহলে কিতাবগণ বিকৃত উচ্চারণ ও মুখ বাঁকিয়ে গ্রন্থ পাঠ করে ভাষাগত জটিলতা সৃষ্টি করত এবং তাদের অনুসারীদের ধোঁকা দিত। আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের এ ভাষাগত বিকৃতি পছন্দ করেননি। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন :
وَإِنَّ مِنْهُمْ لَفَرِيقًا يَلْوُونَ أَلْسِنَتَهُمْ بِالْكِتَابِ لِتَحْسَبُوهُ مِنَ الْكِتَابِ وَمَا هُوَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَقُولُونَ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَمَا هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَيَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ.
‘‘আর তাদের মধ্যে একদল রয়েছে, যারা বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পাঠ করে, যাতে তোমরা মনে কর, তারা কিতাব থেকেই পাঠ করছে, অথচ তারা যা পাঠ করছে তা আদৌ কিতাব নয় এবং তারা বলে : এসব কথা আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল কৃত অথচ এসব আয়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ নয়। তারা বলে : এটি আল্লাহর কথা, অথচ আল্লাহর কথা নয়; আর তারা জেনে শুনে আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে।’’[16] অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন :
مِنَ الَّذِينَ هَادُوا يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ وَيَقُولُونَ سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا وَاسْمَعْ غَيْرَ مُسْمَعٍ وَرَاعِنَا لَيًّا بِأَلْسِنَتِهِمْ وَطَعْنًا فِي الدِّينِ وَلَوْ أَنَّهُمْ قَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَاسْمَعْ وَانْظُرْنَا لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ وَأَقْوَمَ وَلَكِنْ لَعَنَهُمُ اللَّهُ بِكُفْرِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُونَ إِلَّا قَلِيلًا.
‘‘ কোন কোন ইয়াহুদী তার লক্ষ্য থেকে কথার মোড় ঘুরিয়ে নেয় এবং বলে : আমরা শুনেছি কিন্তু অমান্য করছি। তারা আরো বলে : শোন না শোনার মত, মুখ বাঁকিয়ে দ্বীনের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শণের উদ্দেশ্যে বলে ‘রায়িনা’ (আমাদের রাখাল), অথচ যদি তারা বলত : আমরা শুনেছি ও মান্য করেছি (এবং যদি বলত), শোন এবং আমাদের প্রতি লক্ষ্য রাখ, তবে সেই ছিল তাদের জন্য উত্তম, আর সেটাই ছিল যথার্থ ও সঠিক। কিন্তু আল্লাহ্ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন তাদের কুফরীর ধরণ। অতএব, তারা ঈমান আনছে না, কিন্তু অতি অল্প সংখ্যক ঈমান এনেছে।’’[17]
অতএব উচ্চারণ বিকৃতি তথা ভাষা বিকৃতি ইসলামে নিষিদ্ধ। এ জন্য দেখা যায়, মূসা (আ.) স্বীয় ভাষায় উচ্চারণ বিকৃতি থেকে রক্ষা পাওয়ার নিমিত্তে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন :
وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي . يَفْقَهُوا قَوْلِي.
‘‘আর আমার জিহবার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।’’[18]
কাজেই ভাষার বিকৃতি পরিত্যাজ্য। কারণ, ইচ্ছাকৃতভাবে উচ্চারণ বিকৃতি করতে করতে এক সময় তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। তখন মানুষ তার কথা শুনতে পছন্দ করে না। সুতরাং উচ্চারণ বিকৃতি বৈধ নয়; বরং ভাষার মাধূর্য বৃদ্ধির জন্য সকলতে আল্লাহর কাছে দু‘আ করা উচিত।

ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলনের উদ্দেশ্য পর্যালোচনা

ভাষা আন্দোলনের পূর্বোল্লিখিত উদ্দেশ্যের মাঝে এখানে মাতৃভাষা ব্যবহার করার অধিকারের বিষয়টি আসে। এর ব্যাখ্যা করতে গেলে আল-কুর’আন ও সুন্নাহর দিকে দৃষ্টিপাত করলে মানুষের মাতৃভাষা ব্যবহার করা এবং এ ব্যবহারের অধিকার আদায়ের আন্দোলন সম্পর্কে অনেকগুলো দিক পাওয়া যায়। সেগুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো :
ক. ইসলাম ঘোষণা করেছে, মাতৃভাষা ব্যবহার করার অধিকার মানুষের সৃষ্টিগত তথা জন্মগত অধিকার। কারণ মহান আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং সাথে সাথে তাকে তার ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন :
الرَّحْمَنُ . عَلَّمَ الْقُرْآنَ . خَلَقَ الْإِنْسَانَ . عَلَّمَهُ الْبَيَانَ.
‘‘দয়াময় আল্লাহ্। তিনিই শিক্ষা দিয়াছেন কুরআন। তিনিই সৃষ্টি করিয়াছেন মানুষ। তিনিই তাহাকে শিখাইয়াছেন ভাব প্রকাশ করিতে।’’[19]
এ আয়াতে মানব সৃষ্টির সাথে ভাষা শিক্ষার বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। এটির কারণ হলো ভাষা মানুষ সৃষ্টির একটি অবিভাজ্য বিষয়। যে ভাষার মাধ্যমে পরস্পরে ভাব বিনিময় করবে, সে ভাষাই হবে পরস্পরের সম্পর্কের সেতুবন্ধন। মানুষের ভাষা মহান আল্লাহ্ তা‘আলার একটি বিশেষ নি‘আমত। আর মানুষের এ ভাষা কৌশল আল্লাহর ইচ্ছাকৃত সৃষ্টি। এ জন্য আল্লাহ্ তা‘আলা আদম আ.কে সৃষ্টির সাথে সাথেই তাঁকে ভাষাজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা ঘোষণা করেন :
وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنْبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاءِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ . قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ . قَالَ يَا آدَمُ أَنْبِئْهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ فَلَمَّا أَنْبَأَهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَأَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنْتُمْ تَكْتُمُونَ.
‘‘আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তারপর সেই সমুদয় ফিরিশতাদের সম্মুখে প্রকাশ করলেন এবং বললেন : ‘এ সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ তারা বলল : ‘আপনি মহান, পবিত্র। আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ব্যতীত আমাদের তো কোন জ্ঞানই নেই। বস্তুত আপনি জ্ঞানময় ও প্রজ্ঞাময়।’ তিনি বললেন : ‘হে আদম! তাদেরকে এই সকল নাম বলে দাও।’ সে তাদেরকে এ সকলের নাম বলে দিলে তিনি বললেন : ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আকাশমন্ডল ও পৃথিবীর অদৃশ্য বস্তু সম্বন্ধে আমি নিশ্চিতভাবে অবহিত এবং তোমরা যা ব্যক্ত কর বা গোপন রাখ আমি তাও জানি?’’’[20] আলোচ্য আয়াতের أَنْبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاءِ অংশ দ্বারা পৃথিবীর সকল ভাষাকে বুঝানো হয়েছে।[21]
মাতৃভাষার সাথে মানুষের আত্মার সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে মাতৃভাষা ব্যবহার করার অধিকার মানুষের সত্ত্বাগত ও স্ববাবজাত তথা জন্মগত মৌলিক অধিকার। শুধু মৌলিক অধিকারই নয়। এটি মৌলিক অধিকার জরুরী অবস্থায় রাষ্ট্র কর্তৃক স্থগিত ঘোষিত হতে পারে; কিন্তু ভাষা এমন ধরনের অধিকার যা কখনো হস্তক্ষেপযোগ্য নয়। আর এটি করলে মানবসৃষ্টির কাঠামোতেই হস্তক্ষেপ করা হবে, তার অস্তিত্ব ও সত্ত্বাকে অস্বীকার করা হয়। সুতরাং এ যদি হয় ভাষা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, তাহলে তা ব্যবহার করার অধিকার আদায় আন্দোলনে নিঃসন্দেহে কোনরূপ বাধা প্রদান করে না। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলন অধিকার আদায়ের আন্দোলন। আর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করতে ইসলাম বিভিন্নভাবে মানবজাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে।
অধিকার আদায়ের জন্য ইসলামে যুদ্ধের প্রয়োজন হলে যুদ্ধ করে অধিকার আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন :
أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ.
‘‘যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করতে সম্যক সক্ষম।’’[22]
আর এ অধিকার আদায় করতে যেয়ে সংঘর্ষ হলে তাতে যদি কেউ ইন্তিকাল করে তাহলে তাকে শহীদের মর্যাদা দেয়া হবে। কিয়ামতে যার প্রতিদান হবে জান্নাত। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে,
عن زيد بن علي بن حسين عن أبي  عن جده قال : قال رسول الله – صلى الله عليه و سلم – : من قتل دون حقه فهو شهيد.
‘‘যায়িদ ইব্ন ‘আলী ইব্ন হুসাইন তার পিতা থেকে তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করে বলেন : কোন নিপীড়িত অধিকার বঞ্চিত (মুসলিম) নিজের অধিকার তথা হক আদায়ে যুদ্ধ করে নিহত হলে সে শহীদ।’’[23]
অপর এক হাদীসের বর্ণনায় এসেছে যে, সত্যের পথে, ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ও অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করাই সর্বোত্তম জিহাদ। এ প্রসঙ্গে রাসূল সা. বলেন :
عن أبى سعيد الخدرى قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : أفضل الجهاد كلمة عدل عند سلطان جائر . أو أمير جائر .
‘‘আবূ সা‘ঈদ আল-খাদুরী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেন :অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক তথা সঠিক কথা বলা অর্থাৎ ন্যায় অধিকার প্রদান করার স্পষ্ট দাবী করাই শ্রেষ্ঠ জিহাদ।’’[24]
খ. ইসলাম এমন কথা বলে না যে, যেহেতু আল-কুর’আন আরবী বাষায় এবং শেষ নবী সারা বিশ্বের মানুষের নবী আরবী ভাষাভাষী, সেহেতু সারা বিশ্বের মানুষের ভাষা হবে ‘আরবী। তাদের মাতৃভাষা ত্যাগ করে শুধু ‘আরবী ভাষায় কথা বলতে হবে। এর সমর্থনে প্রমাণ স্বরূপ কুর’আন ও হাদীসে অনেক দিক পাওয়া যায়। যেমন :
ইসলাম সারা বিশ্বের মানুষের মাঝে ভাষার বিভিন্নতা ও বৈচিত্রতাকে স্বীকার করে নিয়েছে এবং ঘোষণা করেছে, এ বৈচিত্রতা মানুষের হাতে গড়া নয়। এটি আল্লাহ্ তা‘আলারই সৃষ্টিকুলে এক রহস্যময় নিদর্শন স্বরূপ। কুর’আনুল কারীমে মহান আল্লাহ্ ঘোষণা করেছেন :
وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِلْعَالِمِينَ .
‘‘আর তাঁর নিদর্শনাবলীর অন্যতম নিদর্শন হলো আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণে বৈচিত্রতা। নিশ্চয়ই এতে পৃথিবীবাসীর জন্য রয়েছে বহু নিদর্শন।’’[25]
কথা বলা বা ভাব প্রকাশের মাঝে একই রকম। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বিভিন্ন কোকিলের সুরে যেমন সাদৃশ্য পাওয়া যায়, তেমনি বিভিন্ন মানুষের সুরে ভাষায়ও সাদৃশ্য পাওয়া যায় না। তা ছাড়া পরিবেশ পরিস্থিতি তথা আবহাওয়াজনিত কারণে বাক্য বিন্যাস বৈচিত্রতা ও দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্নতার প্রেক্ষাপটে ভাষায় বিভিন্নতা অহরহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।[26]
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, বর্তমান বিশ্বে ভাষার সংখ্যা ২৭৯৬টি। ক্রমান্বয়ে মানুষ বেড়ে যাচ্ছে। এ ক্ষুদ্র বাংলাদেশেই বাংলা ভাষাতে বৈচিত্র লক্ষ্যণীয়। তাই পৃথিবীর অসংখ্য ভাষাকে একটি ভাষায় রূপ দেয়া ইসলামের উদ্দেশ্য নয় এ দুনিয়াতে। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, ‘‘আল্লাহ্ তা‘আলা সব ভাষাই জানেন।’’[27]
আল্লাহ্ তা‘আলা এ সুন্দর পৃথিবীর মানবজাতির হিদায়াতের জন্য প্রায় লক্ষাধিক নবী প্রেরণ করেছেন। এমনকি প্রত্যেক সম্প্রদায় তথা জাতির জন্য আল্লাহ্ তা‘আলা নবী পাঠিয়েছেন। কুর’আনে আল্লাহ্ তা‘আলা ঘোষণা করেছেন :
إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ بِالْحَقِّ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَإِنْ مِنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ.
‘‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সত্য, সুসংবাদ ও সতর্ককারী রূপে। আর এমন কোন জাতি নেই যার নিকট সর্তকারী প্রেরিত হয়নি।’’[28]
এ প্রসঙ্গে বলা যায় যে, হিন্দুস্থান, চীন, আরব, গ্রিক তথা সারা বিশ্বের ভিন্ন ভাষা-ভাষী মানুষের নিকট আল্লাহ্ তা‘ালা যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। আর তাঁদের ভাষা ছিল মাতৃভাষা। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন :
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ فَيُضِلُّ اللَّهُ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ.
‘‘এ পৃথিবীতে আমি যত নবী রাসূল পাঠিয়েছি, প্রত্যেককে তার মাতৃভাষা তথা স্বজাতির ভাষাভাষী করেই পাঠিয়েছি এজন্য যে, তারা যেন মানুষের নিকট আমার দেয়া দা‘ওয়াত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে পারেন।’’[29]
এ আয়াতের মাধ্যমেও পৃথিবীর সকল ভাষার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। আমরা যদি প্রাচীন নবী-রাসূলদের জীবনেতিহাস বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাব যে, প্রসিদ্ধ আসমানী গ্রন্থগুলো বিভিন্ন ভাষায় নাযিল হয়েছে। যেমন : তাওরাত হিব্রু ভাষায়, যাবুর গ্রিক ভাষায়, ইঞ্জীল সুরিয়ানী ভাষায় এবং মহাগ্রন্থ আল-কুর’আনুল কারীম ‘আরবী ভাষায়। এটাও ভাষা বৈচিত্র স্বীকৃতির জ্বলন্ত প্রমাণ।
এ প্রসঙ্গে আরো লক্ষ্যনীয় যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দো-ভাষী নিয়োগ করতেন। সকল দেশের সকল ভাষার প্রতি গুরুত্বারোপ করে মহানবী সা. যায়িদ ইব্ন সাবিত রা.কে বিদেশী ভাষা শিক্ষা করতঃ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বুঝে তাদের চিঠিপত্র পড়া, লিখা ও ভাব বিনিময়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন।[30]
মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় পৃথিবীতে কিছু কিছু এলাকার অধিকাসীরা তাদের ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছে অফিস আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে মাতৃভাষা ব্যবহার করার জন্য সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায়ের আন্দোলন করছে। সুতরাং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে নির্দিষ্ট ভাষাভাষী জাতি তাদের পরিচিতি বা স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় একটা জাতীয় প্রতীক ধারণ করা ইসলাম বৈধ হিসেবে দেখে। বিভিন্ন সম্প্রদায় বা জাতির সেই প্রতীকী স্বাতন্ত্র্য বা স্বকীয়তাকে ইসলাম স্বীকৃতি দেয়। আল-কুর’আনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে :
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالاً كَثِيراً وَنِسَاء…
‘‘হে মানব! তোমরা ভয় কর তোমাদের রবকে, যিনি পয়দা করেছেন তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে এবং যিনি  পয়দা করেছেন তার থেকে তার জোড়া,আর ছড়িয়ে দিয়েছেন তাদের দু’জন থেকে অনেক নর ও নারী।…’’[31]
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন :
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ.
“হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিতি হতে পার। তবে তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক মর্যাদাবান, যে অধিক আল্লাহকে ভয় করে।’’[32]
উপরিউক্ত আয়াতদ্বয়ে আদম ও তাঁর স্ত্রীর মাধ্যমে পৃথিবীতে মানবকুল ছড়িয়ে দেয়া প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতদ্বয়ের (وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا‘তা থেকেই তাঁর জোড়া সৃষ্টি করেছেন’ এবং (إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى ) ‘আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রীলোক থেকে’ আয়াতাংশদ্বয় দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ্ তা‘আলা স্বীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী আদম ‘আলাইহিস্ সালামকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তার থেকে তাঁর সঙ্গিনী হাওয়াকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তাঁদের উভয় থেকে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও ভাষাভেদে পৃথিবীর সকল মানব-মানবীকে সৃষ্টি করেছেন। আদম ‘আলাইহিস্ সালামকে সৃষ্টির পূর্বেই আল্লাহ্ তা‘আলার পরিকল্পনা ছিল তিনি এ পৃথিবীতে তাঁর খলীফা[33] পাঠাবেন। এর অপরিহার্য অবলম্বন হিসেবেই তিনি হাওয়াকে সৃষ্টি করেছেন।
এ আয়াতে জাতীয় স্বাতন্ত্র্যকে সৃষ্টিকর্মের এক অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অতএব ইসলামের দৃষ্টিতে জাতীয় পরিচয় মেনে নেয়া হয়েছে পরিচিতি তথা বিভিন্ন রকম বিনিময় ও সহযোগিতায় সুবিধার্থ। তবে এটাকে শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড হিসেবে ধরা যাবে না। কারণ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবেন। আলোচ্য আয়াতে এটাই বলা হয়েছে। রাসূল সা. বিদায় হজ্জের ভাষণেও এ ঘোষণা দিয়েছিলেন :
عن جابر بن عبد الله قال : خطبنا رسول الله صلى الله عليه و سلم في وسط أيام التشريق خطبة الوداع فقال :  يا أيها الناس أن ربكم واحد و إن أباكم واحد ألا لا فضل لعربي على عجمي و لا لعجمي على عربي و لا لأحمر على أسود و لا أسود على أحمر إلا بالتقوى إن أكرمكم عند الله أتقاكم.
‘‘জাবির ইব্ন আব্দিল্লাহ্ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সা. আইয়্যামে তাশরীকের দিন বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেন : হে মানুষের! তোমাদের প্রতিপালক একজন, তোমাদের পিতা একজন, সাবধান! অনারব লোকদের উপর আরবীয় লোকদের, আরবীয় লোকদের উপর অনারবের কোন প্রাধান্য নেই, তেমনিভাবে লালের উপর কালো আবার কালোর উপর লাল বর্ণের লোকের কোন প্রাধান্য নেই। তাদের মধ্যে সেই প্রাধান্য পাবে যে মুত্তাকী ও খোদাভীরু। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট সেই সর্বাপেক্ষা উত্তম ও সম্মানিত যে বেশি আল্লাহকে ভয় করে।’’[34]
এভাবে রাসূল সা. ভাষগত শ্রেষ্টত্বের মনোবৃত্তির ঊর্ধ্বে তাকওয়াকে স্থান দিয়েছেন। কোন অঞ্চলের অধিকাসীদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করে স্বকীয় চেতনার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে সে ভাষার সমৃদ্ধি ও উৎকর্ষ সাধন ইসলামের কাম্য। পূর্বে আমরা দেখতে পেয়েছি, মাতৃভাষা সম্পর্কে ইসলাম কতটুকু গুরুত্বারোপ করেছে। কোন রকম জাতীয় স্বার্থ নিয়ে কাজ করলেই তা ইসলাম বিরোধী হবে, এমন ধারণা করা ঠিক নয়। নবীগণের জীবনে জাতীয় স্বার্থ নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়।
মূসা আ. স্বীয় জাতি বনী ইসরাঈলদের স্বার্থে তথা ফির‘আউনের নিপীড়ন থেকে স্বজাতির মুক্তির জন্য ফির‘আউনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন এবং ফির‘আউনের যাদুকরদের সাথে যাদু যুদ্ধের বিরোধীতা করে জয়ী লাভ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল-কুর’আনের ঘোষণা :
حَقِيقٌ عَلَى أَنْ لَا أَقُولَ عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ قَدْ جِئْتُكُمْ بِبَيِّنَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ فَأَرْسِلْ مَعِيَ بَنِي إِسْرَائِيلَ . قَالَ إِنْ كُنْتَ جِئْتَ بِآيَةٍ فَأْتِ بِهَا إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ . فَأَلْقَى عَصَاهُ فَإِذَا هِيَ ثُعْبَانٌ مُبِينٌ . وَنَزَعَ يَدَهُ فَإِذَا هِيَ بَيْضَاءُ لِلنَّاظِرِينَ . قَالَ الْمَلَأُ مِنْ قَوْمِ فِرْعَوْنَ إِنَّ هَذَا لَسَاحِرٌ عَلِيمٌ . يُرِيدُ أَنْ يُخْرِجَكُمْ مِنْ أَرْضِكُمْ فَمَاذَا تَأْمُرُونَ . قَالُوا أَرْجِهْ وَأَخَاهُ وَأَرْسِلْ فِي الْمَدَائِنِ حَاشِرِينَ.
‘‘ইহা স্থির নিশ্চিত যে, আমি আল্লাহ্ সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত বলব না। তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে স্পষ্ট প্রমাণ আমি তোমাদের নিকট এনেছি, সুতরাং বনী ইসরাঈলকে তুমি আমার সঙ্গে যেতে দাও।’ ফির‘আওন বলল : ‘যদি তুমি কোন নিদর্শন এনে থাক তবে তুমি সত্যবাদী হলে তাহা পেশ কর।’ অতঃপর  মূসা  তার  লাঠি  নিক্ষেপ  করল  এবং  তৎক্ষণাৎ তা  এক  সাক্ষাৎ  অজগর  হল। আর সে  তার  হাত বের করল আর তৎক্ষণাৎ দা দর্শকদের দৃষ্টিতে শুভ্র উজ্জ্বল প্রতিভাত হল। ফির‘আওন-সম্প্রদায়ের প্রধানরা বলল : ‘এ তো একজন সুদক্ষ জাদুকর। এ তোমাদেরকে তোমাদের দেশ হইতে বহিষ্কার করতে চায়, এখন তোমরা কী পরামর্শ দাও ?[35] অপর এক আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন :
فَأْتِيَاهُ فَقُولَا إِنَّا رَسُولَا رَبِّكَ فَأَرْسِلْ مَعَنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَا تُعَذِّبْهُمْ قَدْ جِئْنَاكَ بِآيَةٍ مِنْ رَبِّكَ وَالسَّلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى.
‘‘সুতরাং তোমরা তার নিকট যাও এবং বল : ‘আমরা তোমার প্রতিপালকের রাসূল, সুতরাং আমাদের সঙ্গে বনী ইস্রাঈলকে যেতে দাও এবং তাদেরকে কষ্ট দিও না, আমরা তো তোমার নিকট এনেছি তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে নিদর্শন এবং শান্তি তাদের প্রতি যারা অনুসরণ করে সৎপথ।’’[36] উল্লেখ্য যে, বনী ইসরাইলদের সব লোক কিন্তু মুসলমান ছিল না। তবুও মূসা আ. এরকম বক্তব্য ফির‘আউনের নিকট উপস্থাপন করেছেন একমাত্র জাতীয় স্বার্থে।
জাতীয় স্বার্থে কাজ করা ইসলামের পরিপন্থী নয় যদি না সেটি ইসলামের মৌলিক আকীদা, বিশ্বাস, আচার-আচারণের সাথে দ্বান্দ্বিক হয়। যেমন ইসলামী দা‘ওয়াতের পথে বাধা নিরসনের লক্ষ্যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে প্রয়োজনে অস্ত্র ধরতে হবে। এটি ইসলামের মূলনীতির অন্তর্ভূক্ত। এ সম্পর্কে আল-কুর’আনে বলা হয়েছে :
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ.
‘‘ বল : তোমাদের নিকট যদি আল্লাহ্, তাঁহার রাসূল এবং আল্লাহ্র পথে জিহাদ করা অপেক্ষা অধিক প্রিয় হয় তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের স্বগোষ্ঠী, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য-যার মন্দা পড়ার আশংকা কর এবং তোমাদের বাসস্থান -যাহা তোমরা ভালবাস, তবে অপেক্ষা কর আল্লাহ্র নির্দেশ আসা পর্যন্ত।’ আল্লাহ্ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।’’[37]
এ আয়াতে আল্লাহর দ্বীন ইসলামের মৌলিক স্বার্থকে পারিবারিক, অর্থনৈতিক গোষ্ঠীগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া হয়েছে এবং এর পরিপন্থী কোন ভূমিকার ব্যাপারেও মানব সমাজকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে কোন ভাষা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পেলে তার উৎকর্ষ সাধনে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও বৃদ্ধি পাবে। সে অর্থে জাতীয় ভাষার উৎকর্ষ সাধিত হলে সেটি ইসলামের মূল্যবোধ ও জীবনবোধের পরিপন্থী হবে না। কোন এলাকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মুখের ভাষা উপেক্ষা করে অন্য ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা চরম অন্যায়। এ অন্যায় প্রতিরোধ করতে হবে গণ আন্দোলনের মাধ্যমে। বাংলাভাষা আন্দোলনে তাই ঘটেছে। যে জন্য এটা অবশেষে এ অঞ্চলের অবহেলিত জনতার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সকল বৈষম্য দূরীকরণ তথা স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রূপ নেয়। সুতরাং স্বাধিকার আদায়ের অর্থে ভাষা আন্দোলনের ব্যাখ্যা করা হোক, আর প্রেরণা গ্রহণ করা অর্থে হোক, তা ইসলামের পরিপন্থী নয়; বরং এ সম্পর্কে ইসলামের ভূমিকা সুস্পষ্ট। বহুসংখ্যক আয়াত ও হাদীস রয়েছে এ ব্যাপারে। সবগুলোয় প্রত্যেকের ন্যায্য অধিকার প্রদান করার জন্য নির্দেশ করা হয়েছে। এ স্বল্প পরিসরে সূরা নিসার একটা আয়াতই যথেষ্ট মনে করছি। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন :
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُمْ بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا.
‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত উহার হকদারকে প্রত্যর্পণ করতে। তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে। আললাহ্ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন তা কত উৎকৃষ্ট! নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’’[38]
ইসলাম মাতৃভাষার উপর পূর্ণ গুরুত্বারোপ করে থাকে, মাতৃভাষার অধিকার স্বীকার করে নিয়ে তার সমৃদ্ধিতে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে, বিভিন্ন ভাষার স্বীকৃতি দেয়, ভাষা বৈচিত্রকে সৃষ্টিকলার রহস্য মনে করে, বিভিন্ন ভাষায় ইসলামকে তুলে ধরার জন্য অনুপ্রাণিত করে। ইসলাম কোন নির্দিষ্ট ভূখন্ডের মানুষের ভাষার বিরুদ্ধে কোন ভূমিকা নিতে পারে না। কোন মুসলমান যদি ভুলবশতঃ এ ধরনের কোন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে, তবে সেটা তার নিজস্ব।
ইসলাম মানবজীবনের মৌলিক সমস্যার সমাধান করে, দুনিয়া ও আখিরাতের সার্বিক কল্যাণের জন্য বিভিন্ন নিয়ম তথা হালাল-হারাম এবং কর্তব্য ও অধিকারের সীমা নির্ধারণ করে দেয় মানবজীবনের লক্ষ্য অর্জনে অনুপ্রাণিত করে। নির্দিষ্ট কোন অঞ্চল, ভাষা বা জনগোষ্ঠীতে একে সীমাবদ্ধ করা সমীচীন নয়। ইসলাম সম্পর্কে কোন ধারণার জন্য ইসলামের প্রধান উৎস কুর’আন-সুন্নাহর দৃষ্টিভঙ্গি অনুধাবনের পর তা করা উচিত। যার যতটুকু ভাল আছে, তা গ্রহণ করা এবং মন্দটুকু বর্জন করা ইসলামের রীতি। প্রত্যেকের মাতৃভাষা সর্বস্তরে চর্চা ও অনুশীলনের মাধ্যমে এর উৎকর্ষ সাধন করার কাজে নিয়োজিত হওয়া দরকার। বিশ্বে ইসলামের দাওয়াত প্রচারের জন্য বিশ্বের প্রতিটি ভাষারই চর্চা করা ইসলামী দা‘ঈদের কর্তব্য। অতএব, প্রতিটি ভাষায় ইসলামী সাহিত্য গড়ে তুলে মানব কল্যাণে কাজ করতে হবে। জাতীয়তার প্রেক্ষিতে যেমন ইসলামের সার্বজনীনতা সীমিত করা ঠিক নয়, তেমনি ইসলামের বিশ্বজনীনতার কথা তুলেও কোন অঞ্চলের ভাষার উপর হস্তক্ষেপ করা বা তার গুরুত্ব উপেক্ষা করা অবৈধ।
আল্লাহ্ তা‘আলা এ পৃথিবীতে নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন মানুষদেরকে পথভ্রষ্টতা থেকে হিদায়াতের দিকে পথ দেখানোর জন্য এবং এ নবী ও রাসূলদের মূল কাজ ছিল দা‘ওয়াত দেয়া। তাই দা‘ওয়াত দানের ক্ষেত্রে ভাষা ও সাহিত্যের গুরুত্ব অপরিসীম। এ জন্য ভাষা চর্চা ও সমৃদ্ধির জন্য ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে। সুতরাং ভাষা চর্চা বা সমৃদ্ধ করার লক্ষে ভাষা আন্দোলন করা ইসলামের দৃষ্টিতে খুবই পূণ্যের কাজ বলেই মনে হয়। কেননা কোন জাতির নিকট দাওয়াত দিতে গেলে আগে ঐ জাতির ভাষা দাঈকে অবশ্যই জানতে হবে এবং তাদের সামনে স্পষ্ট ভাষায় বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে। এজন্য মূসা আ. আল্লাহর নিকট তার ভাষা অস্পষ্ট হওয়ার কারণে তাঁর ভাইয়ের নবুওয়াতী দাবী করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন :
وَأَخِي هَارُونُ هُوَ أَفْصَحُ مِنِّي لِسَانًا فَأَرْسِلْهُ مَعِيَ.
‘‘আমার ভাই হারুন আমার চেয়ে সুন্দরভাবে ও স্পষ্টভাষায় কথা বলতে পারে, সুতরাং আপনি তাকে আমার সাথে সাহায্যকারী হিসেবে প্রেরণ করুন।[39]
কাজেই ইসলামী আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ভাষা আন্দোলন ছিল একটি জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষা শহীদদের মূল্যায়ন ও আমাদের করণীয়

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী ৮ ফাল্গুন বাংলাভাষা আন্দোলন রক্তঝরা, অগ্নিক্ষরা এক মহান স্মৃতি বিজড়িত একটি দিনের নাম। যা যুগে যুগে সারা বিশ্বের মানবসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে। ইতিহাসের সে অধ্যায় রচিত হয়েছিল এ পূর্ব বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) কিছু অকুতোভয় যুবক সালাম, রফিক, জববার ও বরকতের মত আরো অনেক যুবকের তাজা রক্তের বিনিময়ে। মাতৃভাষা বাংলাভাষা, যে ভাষার সাথে এ দেশের মানুষের নাড়ির সম্পর্ক। সে ভাষায় কথা বলা তথা মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় তাঁরা নিজেদের মহামূল্যবান জীবন নির্দিধায় বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাদের এ আত্মদানকে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন যে, তারা শহীদ কি-না?
উল্লেখ্য যে, মহান আল্লাহ্ রাববুল আলামীনের একক সাবভৌমত্ব, শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাত ও শেষ বিচারের দিনসহ পরকালীন অন্যান্য বিষয়র প্রতি অকুণ্ঠ চিত্তে নিজের আন্তরিক বিশ্বাসের মৌখিক ঘোষণাদান এবং রিসালাতের মাধ্যমে মহানবী সা.-এর কাছে প্রেরিত আল্লাহ্ প্রদত্ত মানবজীবনের বিধান সমাজ জীবনের সর্বস্তরে বাস্তবায়নের সংগ্রামে ইসলামী বিরোধী শক্তির হাতে মৃত্যু বরণ করাকেই শহীদ বলে।
মাতৃভাষা ব্যবহার করার অধিকার মানুষের সৃষ্টিগত তথা জন্মগত অধিকার। কারণ মহান আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং সাথে সাথে তাকে তার ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন :
الرَّحْمَنُ . عَلَّمَ الْقُرْآنَ . خَلَقَ الْإِنْسَانَ . عَلَّمَهُ الْبَيَانَ.
‘‘দয়াময় আল্লাহ্। তিনিই শিক্ষা দিয়াছেন কুরআন। তিনিই সৃষ্টি করিয়াছেন মানুষ। তিনিই তাহাকে শিখাইয়াছেন ভাব প্রকাশ করিতে।’’[40]
আলোচ্য আয়াতের মাধ্যমে জানা যায় যে, মানুষ সৃষ্টির সাথে ভাষার এক অঙ্গাঙ্গিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই মাতৃভাষা মানুষের একটি সৃষ্টিগত অধিকার। তাই কেউ যদি এ অধিকার ছিনিয়ে নিতে চায় তার প্রতিরোধ করা অপরিহার্য। আর এ প্রতিরোধে কেউ নিহত হলে ইসলামের দৃষ্টিতে সে শহীদের মর্যাদা পাবে। তবে শর্ত হলো, তাদেরকে প্রকৃতভাবে এমন মুসলমান হতে হবে যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিহত হয়। এখানে আরো একটি প্রশ্ন থেকে যায় আর তা হলো, যারা নাস্তিক তারাও ভাষা আন্দোলনে নিহতদেরকে শহীদ বলে থাকেন, কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাদের ব্যাখ্যা ভিন্নরূপ বলে মনে হয়। কেননা তারা তো আল্লাহ্ ও পরকালকেই বিশ্বাস করেন না। তাই শহীদ বলতে ইসলামের সেই শহীদ মনে করাটা বাঞ্ছনীয় নয়। তাই এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণকারীদের নিকট শহীদ অর্থ হলো স্বরণীয় অনুকরণীয় মডেল মনে করা। প্রকৃতপক্ষে এ বিষয়ে যেমন রয়েছে পারিভাষিক জটিলতা, তেমনি রয়েছে নিহত ব্যক্তির উদ্দেশ্য ও অবস্থাগত অস্পষ্টতা। সুতরাং যিনি যে ধরনের বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন, তিনি সে অনুসারেই ভাষার জন্য শহীদ হওয়া সম্পর্কে মূল্যায়ন করবেন। আর এটাই হওয়া স্বাভাবিক।[41]
আমরা বাংলাদেশের অধিবাসী, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। আমরা আজ মাতৃভাষায় কথা বলি। এর পেছনে এসকল শহীদদের অবদানই সর্বাগ্রে। কাজেই এ ভাষা শহীদদের প্রতি আমাদেরও কিছু করণীয় রয়েছে। তাই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় যেসকল অকুতভয় মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিল তারা যদি ইসলামী শহাদাতের শর্তগুলো পূরণ করে থাকেন, কুর’আন-হাদীসের আলোকে তাদেরকে আমরা জান্নাতবাসীই বলব। তাদের নাজাতের ব্যাপারে আল্লাহই সর্বজ্ঞাত। অন্যথায় তাদের ভিতর যদি সে রকম শর্তাবলী অনুপস্থিত থেকেও থাকে, তবুও তারা যেহেতু আমাদের অধিকার আদায়ের জন্যেই প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন সুতরাং মুসলমান হিসেবে তাদের জন্য আমাদের কর্তব্য হলো আল্লাহর কাছে মাগফিরাত তথা ক্ষমা ভিক্ষা চাওয়া। কেননা, এটি একটি সদকায়ে জারিয়ার মত। আর এ সম্পর্কে হাদীসের একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, যদি কেউ কোন সদকায়ে জারিয়ার মত সৎকর্ম সম্পাদন করে, তাহলে যত প্রাণী তা থেকে উপকৃত হবে, সে ঐসকল মানুষের নেকীর একটি অংশ পেয়ে যাবে।[42]
অবশ্য কোন কোন ধর্ম ও সমাজে গান বাজনর মাধ্যমে তাদের দেব-দেবীদেরকে স্মরণ করে থাকে এবং এর মাধ্যমে তারা তাদেরকে খুশী করার চেষ্টা করে। সেটা তাদের ধর্মীয় ব্যাপার। আমরা মুসলমান, আমাদের ধারণা মতে শহীদরা পরকালে অবস্থান করছেন। তাই যে সকল কাজ-কর্ম তাদের উপকারে আসে সে সকল কাজই বেশি বেশি করা।
উপসংহার
বিশ্বে ইসলামের দা‘ওয়াত প্রচারের জন্য বিশ্বের প্রতিটি ভাষারই চর্চা করা ইসলামী দা‘ঈদের কর্তব্য। অতএব, প্রতিটি ভাষায় ইসলামী সাহিত্য গড়ে তুলে মানব কল্যাণে কাজ করতে হবে। জাতীয়তার প্রেক্ষিতে যেমন ইসলামের সার্বজনীনতা সীমিত করা ঠিক নয়, তেমনি ইসলামের বিশ্বজনীনতার কথা তুলেও কোন অঞ্চরের ভাষার উপর হস্তক্ষেপ করা বা তার গুরুত্ব উপেক্ষা করা আদৌ উচিত নয়। ইসলাম ভাষাগত জাতীয়তার ঊর্ধ্বে। বিশ্বজনীন ধর্ম হিসেবে সকল ভাষাই তার নিজস্ব। মানবসমাজের সকলের মাতৃভাষা চর্চা ও সমৃদ্ধি সাধনে সে অনুপ্রাণিত করে। এটা মানুষের জন্মগত অধিকার হিসেবে মনে করে। এতে কোন রকম হস্তক্ষেপ ইসলাম অনুমোদন করে না। ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলতে হলে তার মূল উৎস কুর’আন সুন্নাহতে কী আছে সর্বপ্রথম তাই দেখ প্রয়োজন। পরিশেষে ভাষা আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে যার যতটুকু ভাল আছে তা গ্রহণ করে এবং মন্দটুকু বর্জন করে উদার মন নিয়ে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে মাতৃভাষার উৎকর্ষ সাধনে কাজ করা একান্ত আবশ্যক।


[1].   ড. রামেশ্বর, সাধারণ ভাষা বিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা, (কলিকাতা, ১৩৯৯ বাং), পৃ. ৮।
[2].  Encyclopedia of Britanica, (London: encyclopedia Britanica, Inc.1980), Vol. 10, P. 642.
[3]. Edger H. Sturtevant, An introduction to languistic Science, (New Haven:Yale University Press, 1947), Chapter-1.
[4].  ভাষাবিজ্ঞানীগণ উল্লেখিত প্রতীককে Agreed vocal system which is also arbitpary-বলে উল্লেখ করেছেন।
-Barnard Block & Goerge Tregar, Outline of linguistic Analysis, (America Baltimore, 1942); ড. মো : আ. আউয়াল, ভাষাতত্ত্বের সহজকথা, (ঢাকা : গতিধারা প্রকাশনী, ২০০০ খ্রি.), পৃ. ১১।
[5].   আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ, আধুনিক ভাষাতত্ত্ব, (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৮৫ খ্রি.), পৃ. ১।
[6].   সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান, সম্পা. প্রফেসর আহমদ শরীফ, (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৯২), পৃ. ৪৫।
[7].   খন্দকর কামরুল হুদা, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও শেখ মুজিব, ১৯৯৫ খ্রি., পৃ. ৩২।
[8].   মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশের তারিখ, (ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স, ২০০১ খ্রি.), পৃ. ১৫।
[9].   রফিকুল ইসলাম, স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, (ঢাকা : ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০০৪ খ্রি.), পৃ. ৫১।
[10].   আল-কুর’আন, সূরা আর-রূম, আয়াত : ৩০।
[11].   আল-কুর’আন, সূরা ইবরাহীম, আয়াত : ৪।
[12].   ইবনুল ‘আরাবী, আল-মু‘জাম, প্রাগুক্ত, খ. ৫, পৃ. ৩৫৫, হাদীস নং-২৩৪৫।
[13].  ইব্নুল মুলাক্কীন, সিরাজুদ্দীন আবূ হাফস ‘উমর ইব্ন আলী ইব্ন আহমাদ আশ-শাফি‘ঈ আল-মিসরী, আল-বদরুল মুনীর ফী তাখরীযিল আহাদীসি ওয়াল আছারুল ওয়াকি‘আহ ফীশ শারহিল কাবীর, (রিয়াদ : দারুল হিজরাত, ২০০৪ ইং), খ. ৮, পৃ. ২৮১।
[14].   বুখারী, আস-সহীহ, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৯২৩, হাদীস নং-৪৭৫৪।
[15].  আল-আলবানী, মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন ইবনুল হাজ্জ নূহ, (রিয়াদ : দারুল মা‘রিফাহ, ১৯৯২ ইং),  খ. ১, পৃ. ১১০, হাদীস নং-৩৬।
[16].   আল-কুর’আন, সূরা আলে ‘ইমরান, আয়াত : ৭৮।
[17].   আল-কুর’আন, সূরা আন-নিসা, আয়াত : ৪৬।
[18].   আল-কুর’আন, সূরা ত্বাহা, আয়াত : ২৭-২৮।
[19].   আল-কুর’আন, সূরা আর্ রহমান, আয়াত : ১-৪।
[20].    আল-কুর’আন, সূরা আল-বাকরাহ, আয়াত : ৩১-৩৩।
[21].  আলুসী, শিহাবুদ্দীন মাহমুদ ইব্ন আব্দিল্লাহ্ আল-হুসাইনী, রূহুল মা‘আনী ফী তাফসীরিল কুর’আনিল ‘আজীম ওয়াস সাব‘য়িল মাছানী, (বৈরূত : দারুল ফিকর, তা.বি.), খ. ১, পৃ. ২৬১; ‘আব্দুল ‘আযীয ইব্ন আব্দিস সালাম ইবনিল আবিল কাসিম ইবনুল হুসাইন, তাফসীরু ইব্ন আব্দিস সালাম, (বৈরুত : দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, তা.বি.), খ. ১, পৃ. ৩৫।
[22].    আল-কুর’আন, সূরা আল-হাজ্জ্ব, ২২ : ৩৯।
[23].   আবূ ইয়া‘লা, আহমাদ ইব্ন ‘আলী ইব্ন মাছনা, আল-মুসনাদ, (দামিস্ক : দারুল মা’মূন লিত তুরাছ, ১৪০৪ হি.), খ. ১২, পৃ. ১৪৬, হাদীস নং-৬৭৭৫।
[24].   আবু দাউদ, সুলায়মান ইব্ন আল-আশ-আশ, আস-সুনান, (বৈরূত : দারুল ফিক্র, তাবি), খ. ৪, পৃ. ২১৭, হাদীস নং-৪৩৪৬; ইমাম ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, (বৈরুত : দারুল্ কিতাবিল আরাবী, তা.বি.), খ. ২, পৃ. ১৩২৯; হাদীস নং-৪০১১; তিরমিযী, আবূ ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা, আস-সুনান, (বৈরূত : দারু ইহইয়ায়িত্-তুরাছিল আরাবী, ১৪২১হি.), খ. ৪, পৃ. ৪৭১, হাদীস নং-২১৭৪।
[25].   আল-কুর’আন, সূরা আর-রূম, ৩০ : ২২।
[26].   ইব্ন খালদূন, আল-মুকাদ্দিমা, (বৈরূত : দারুল ফিকর, ১৯৭৯ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৭১, ৩৫৮।
[27].   বুখারী, আস-সহীহ।
[28].   আল-কুর’আন, সূরা ফাতির, আয়াত : ২৪।
[29].   আল-কুর’আন, সূরা ইবরাহীম, আয়াত : ৪।
[30].   এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে,
قال خارجة بن زيد بن ثابت عن زيد بن ثابت أن النبي صلى الله عليه و سلم أمره أن يتعلم كتاب اليهود حتى كتبت للنبي صلى الله عليه و سلم كتبهن وأقرأته كتبهم إذا كتبوا إليه  وقال عمر وعنده علي وعبد الرحمن وعثمان ماذا تقول هذه ؟ قال عبد الرحمن ابن حاطب فقلت تخبرك بصاحبها الذي صنع بها.
বুখারী, আস-সহীহ, প্রাগুক্ত, খ. ৬, পৃ. ২৬৩১।
[31] .  আল-কুর’আন, সূরা আন নিসা, আয়াত : ১।
[32].   আল-কুর’আন, সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯ : ১৩।
[33].    পৃথিবীতে প্রতিনিধি প্রেরণ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন : .  إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً‘‘আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি   করতে চাই।’’ -আল-কুর’আন, সূরা আল-বাকারাহ ২ : ৩০।
[34].   বাইহাকী, আবূ বকর আহমাদ ইব্নুল হুসাইন, শু‘আবুল ঈমান, (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, ১৪১০ হি.), খ. ৪, পৃ. ২৮৯, হাদীস নং-৫১৩৭।
[35].   আল-কুর’আন, সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত : ১০৫-১১১।
[36].   আল-কুর’আন, সূরা ত্বাহা, আয়াত : ৪৭।
[37].   আল-কুর’আন, সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত : ২৪।
[38].   আল-কুর’আন, সূরা আন-নিসা, আয়াত : ৫৮।
[39].   আল-কুর’আন, সূরা আল-ক্বাসাস, আয়াত : ৩৪।
[40].   আল-কুর’আন, সূরা আর্ রহমান, আয়াত : ১-৪।
[41].  ড. মুহাম্মদ আব্দুর রহমান আন্ওয়ারী, মাতৃভাষা আন্দোলন ও ইসলাম, (ঢাকা : মুহাম্মদ ব্রাদার্স, ২০০৩ খ্রি.), পৃ. ১০৪।
[42].   মুসলিম, আস-সহীহ, প্রাগুক্ত, খ. ৫, পৃ. ৭৩, হাদীস নং-৪৩১০।

নেক আমলের যত্ন ও অধ্যবসায়


রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

লেখক : আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান | সম্পাদক : চৌধুরী আবুল কালাম আজাদ

ভূমিকা :

অনেক সময় এমন হয়, একটা নেক আমল বা সৎকর্ম করতে করতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি। অবশেষে এক সময় তা ছেড়ে দিই। আবার অনেক সময় করবো করবো  বলে নেক আমল শুরু করা হয় না।একজন ঈমানদার, মুহসিন মানুষ কখনো এমন করে না, করতে পারে না, করা তার জন্য শোভনীয় নয়। বক্ষমান আলোচনায় এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে আল কুরআনের আয়াত ও সহীহ হাদীসের আলোকে।
আল্লাহ তাআলা বলেন: যারা ঈমান এনেছে তাদের হৃদয় কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য নাযিল হয়েছে তার কারণে বিগলিত হওয়ার সময় হয়নি? আর তারা যেন তাদের মত না হয়, যাদেরকে ইতঃপূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল, তারপর তাদের উপর দিয়ে দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হল, অতঃপর তাদের অন্তরসমূহ কঠিন হয়ে গেল। আর তাদের অধিকাংশই ফাসিক। [সূরা আল হাদীদ, আয়াত ১৬]

আয়াত থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল :

এক. সাহাবায়ে কেরামের একটি দল যখন হাসি তামাশা বেশী করেছেন তখন তাদের সম্পর্কে এ আয়াত নাযিল হয়েছে। অতএব ঈমানদারদের বেশী রঙ -তামাশা, হাসি-বিনোদন পরিহার করা কর্তব্য।
দুই. আল্লাহ তাআলার ভয় ও স্মরণে ঈমানদারের অন্তর বিগলিত থাকা উচিত। যখন অন্তর বিগলিত থাকবে তখন ঈমানদারগণ আল্লাহ তাআলার ইবাদত-বন্দেগী নিয়মিত আদায় করবেন ও তাতে যত্নবান হবেন।
তিন. যাদের ইত:পূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল তারা হল ইহুদী ও খৃষ্টান। তাদের অন্তর এতটা কঠিন হয়ে গেছে যে তারা সৃষ্টিকর্তার নাযিলকৃত বিধি-বিধান সম্পর্কে কোন কিছু ভাবতে চায় না। তাঁর হক বা পাওনা সস্পর্কে একেবারে উদাসীন। ফলে তারা পাপাচারীর খাতায় নাম লেখাল। শেষ পর্যন্ত নিজেদের ধর্মটার মূল চরিত্র পাল্টে দিল। ধর্ম আর ধর্ম থাকল না। বিকৃত করে ফেলল। কিছু পর্ব আর অনুষ্ঠানে আটকে দিল ধর্মটাকে। আদর্শ আর নৈতিকতা বোধে উজ্জীবিত হওয়া ও জীবনাচার শুদ্ধ করার সব আবেদন গেল হারিয়ে। মুসলিমদের এ রকম হওয়া কখনো উচিত নয় বলে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে দিলেন তাঁর এ আয়াতে।আল্লাহ তাআলা বলেন: তারপর তাদের পিছনে আমি আমার রাসূলদেরকে অনুগামী করেছিলাম এবং মারইয়াম পুত্র ঈসাকেও অনুগামী করেছিলাম। আর তাকে ইনজীল কিতাব দিয়েছিলাম এবং যারা তার অনুসরণ করেছিল তাদের অন্তরসমূহে করুণা ও দয়া-মায়া দিয়েছিলাম। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তারাই বৈরাগ্যবাদের প্রবর্তন করেছিল। এটা আমি তাদের ওপর লিপিবদ্ধ করে দেইনি। তারপর তাও তারা যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করেনি। [সূরা আল হাদীদ, আয়াত ২৭]

আয়াত থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল :

এক. মানুষের অন্তরের বিনয় ও ভালো কাজ করার প্রেরণা ও একাগ্রতা আল্লাহ তাআলার একটি দান।
দুই. যদি কোন ব্যক্তি নিজের উপর কোন নেক আমল আরোপ করে নেয় তাহলে তার উপর অটল থাকা কর্তব্য।
তিন. রুহবানিয়্যাহ অর্থ হল বৈরাগ্যবাদ। কোন মানুষ যখন বিয়ে শাদী সংসার-কর্ম ও যৌনাচার থেকে বিমুখ হয় তখন আমরা বলি সে বৈরাগ্যবাদ অবলম্বন করেছে বা বৈরাগী হয়ে গেছে। খৃষ্টান ধর্মযাজক বা পাদ্রী-পুরোহিতদের জন্য -তাদের বিশ্বাস মতে- বৈরাগ্যবাদ অবলম্বন জরুরী। এ জন্য খৃষ্টান পাদ্রী ও নান তথা যে সকল নারী ও পুরুষ ধর্মের সেবায় নিয়োজিত তারা কখনো বিয়ে – শাদী, ঘর-সংসার করে না।
চার. আল্লাহ তাআলা বৈরাগ্যবাদ অবলম্বনের নির্দেশ দেননি। এটা খৃষ্টানেরা ধর্মের নামে ধর্মের মধ্যে একটি বিদআত চালু করেছে। এবং তারা এটাকে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের বড় মাধ্যম বলে মনে করে নিয়েছে।
পাঁচ. তারা বৈরাগবাদকে অবলম্বন করেও তার উপর অটল থাকেনি। আমরা প্রায়ই খবরে শুনে থাকি অমুক পাদ্রী, অমুক ধর্মযাজকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। খৃষ্টান চার্চ ও গৃর্জাগুলোতে যৌন নিপীড়ণ যেন একটি নিয়মিত কাহিনীতে পরিণত হয়েছে। সেখানে শিশুরা পর্যন্ত যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। আল্লাহ তাআলা বলতে চান, হে খৃষ্টান সম্প্রদায়! ধর্মের প্রতি তোমাদের কেন যত্ন নেই? আমার সত্যিকার আদেশ নিষেধ তো পরের কথা, তোমরা যে বিষয়টিকে ধর্ম বলে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করো সেটাই তো লংঘন করে থাকো।
ছয়. খৃষ্টানদের এ স্বভাবটি উল্লেখ করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের মেসেজ দিচ্ছেন, তোমরা মুসলিমরা ধর্মের ব্যাপারে খৃষ্টানদের মত উদাসীন হবে না, বরং যত্নবান হতে চেষ্টা করো।
আল্লাহ তাআলা বলেন: আর তোমরা সে নারীর মত হয়ো না, যে তার পাকানো সূতো শক্ত করে পাকানোর পর টুকরো টুকরো করে ফেলে। [সূরা আন নাহল, আয়াত ৯২]

আয়াত থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল :

এক. কোন একটি কাজ করে তা বিনষ্ট করে দেয়া ঠিক নয়। এমনিভাবে কোন নেক আমল শুরু করে তা পরিহার করা অনুচিত
দুই. প্রতিটি নেক আমল বা সৎকর্ম সম্পাদনের ক্ষেত্রে অটলতা ও অবিচলতা অবলম্বন জরুরী। এমনিভাবে গোটা ইসলামী অনুশাসন মানার ক্ষেত্রে ঈমানদারদের অবিচল হওয়া কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন: আর ইয়াকীন (মৃত্যু) আসা পর্যন্ত তুমি তোমার রবের ইবাদাত কর। [সূর আল হিজর, আয়াত ৯৯]

আয়াত থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল :

এক. মৃত্যু আসা পর্যন্ত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইবাদত-বন্দেগী করতে হবে। বিরামহীনভাবে, অবিচল ও অটলতার সাথে।
দুই. কোন নেক আমল বা সৎকর্ম শুরু করলে তা ত্যাগ করা উচিত নয়। বরং সে কাজটির উপর অটল থাকা সে কাজের প্রতি ভালবাসা ও আন্তরিকতারই প্রমাণ। যদি কাজটি ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে বুঝে আসবে এ কাজটি তার কাছে আর ভাল লাগে না।
তিন. মানুষ স্বভাবগত ভাবেই প্রতিদিন নতুন নতুন দৃষ্টিভংগি গ্রহণ, নতুন বিষয় ভাবতে ও নতুন পরিকল্পনা করতে পছন্দ করে। কিন্তু এটাকে যদি জীবনের একটি অভ্যাস বানিয়ে নেয়া হয়, আর এ অভ্যাস যদি সংশোধন করা না হয় তাহলে জীবনে বড় কোন কিছু করা সম্ভব হবে না তার পক্ষে।
উমার ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি রাতে তার জিকির-পাঠ আদায় না করে ঘুমিয়েছে, অথবা আদায় করেছে তবে কিছু বাকী রয়ে গেছে অত:পর তা ফজর ও জোহরের মধ্যবর্তী সময়ে পড়ে নেয়, তার জন্য রাতে পাঠের সওয়াব দেয়া হয়। (মুসলিম- ১)

হাদীসটি থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল :

এক. হিযব শব্দের আভিআনিক অর্থ হল অংশ। পরিভাষায় এর অর্থ বুঝাতে আমরা বলে থাকি অজীফা। অর্থাৎ কোন মানুষ যখন কোন জিকির আজকার বা তেলাওয়াত নিয়মিত করে থাকে, তাকে আমরা অজীফা বলে থাকি। যেমন কোন ব্যক্তি ফজরের নামাজের পর প্রতি দিন এক পারা কুরআন তেলাওয়াত করে থাকে। এটি তার একটি অজীফা। আবার কেহ আছে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিছু মাসনূন দুআ-জিকির আদায় করে বা কুরআন থেকে পাঠ করে। এটি তার অজীফা। শুরু করলে এগুলো নিয়মিত আদায় করা কর্তব্য।
দুই. যদি কখনো নির্দিষ্ট সময়ে এগুলো আদায় করা না যায় তাহলে পরে আদায় করে নিলে সওয়াব পাওয়া যায়।
তিন. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। কিন্তু কখনো কোন কারণে তা ছুটে গেলে তিনি পরে আদায় করে নিতেন।
চার. নিয়মিত নেক আমলগুলোর প্রতি যত্নবান হতে উৎসাহিত করেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন: হে আব্দুল্লাহ! তুমি অমুক ব্যক্তির মত হয়ো না, যে রাতে নামাজ পড়ত, কিন্তু পরে রাতে নামাজ পড়া ছেড়ে দিয়েছে। (বুখারী :২৫২)

হাদীসটি থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল :

এক. কোন নেক আমল কয়েকদিন নিয়মিত কয়েকদিন করে তা ছেড়ে দেয়া উচিত নয়। এটা নেক আমলের প্রতি যত্নবান না হওয়ার শামিল।
দুই. তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের ফজিলত জানা গেল। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করতে না পারতেন তখন তিনি পরদিন বারো রাকাত নামাজ আদায় করে নিতেন। (মুসলিম, রিয়াদুস সালেহীন ১১৮১)

হাদীসটি থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল :

এক. নিয়মিত নেক আমলগুলো কোন কারণে ছুটে গেলে তা কাজা করা যেতে পারে।
দুই. এটা নেক আমলের প্রতি যত্নবান হওয়ার একটি দৃষ্টান্ত।
আবু হুরায়রা(রা) রাসূল (সা) থেকে বর্ণণা করেছেন, “শ্রেষ্ঠ নেক আমল সেটাই যা নিয়মিত করা হয় যদিও তা সংখ্যায় অল্প হয়।” (সুনানে ইবনে মাজাহঃ ৪২৪০)
হাদীসটি থেকে শিক্ষা ও মাসায়েলঃ
এক. নেক আমল পরিমানে অল্প হলেও তা নিয়মিত করতে হবে।
দুই আল্লাহর কাছে ইবাদত ও ভালোকাজের বাহ্যিক ‘পরিমান’ ও ‘সংখ্যার’ চেয়েও কাজটির ‘মান’, ইখলাস ও নিয়মতান্ত্রিকতাই বেশী গুরূত্বপূর্ণ।
সমাপ্ত