যারা জীবনে আমার মতো অনেক বেশী পাপ করে ফেলেছেন?


যারা জীবনে আমার মতো অনেক বেশী পাপ করে ফেলেছেন, পৃথিবীর এই সংকটকালীন মুহুর্তে নিজের পাপের জন্য অনুশোচনা হচ্ছে, অনুতপ্ত হচ্ছেন,
যাদের মন একটু নরম হয়েছে, যারা আল্লাহর কাছে তাওবা, ইস্তিগফার করবেন বলে ভাবছেন, কিন্তু কিভাবে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না, তাদের জন্য আমার দুইটা নাসীহা বা পরামর্শ। কষ্ট করে পড়লে আশা করি উপকৃত হবেন। সবচেয়ে প্রথমে যেটা বলতে চাই সেটা হচ্ছে,

❒ নিয়াতঃ

সবচেয়ে প্রথমে যে কাজ টা করতে হবে সেটা হচ্ছে আমাদের নিয়াত টা বিশুদ্ধ করতে হবে। কারন

"ইন্নামাল আমালু বিন নিয়াত"। (সহীহ্ বুখারী)

অর্থাৎ সব কাজ নিয়তের ওপড় নির্ভরশীল। আল্লাহ নিয়তের ওপড় সব কাজের ফায়সাল দেন।

আর সহীহ নিয়াত মানে হচ্ছে, আমরা নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, দান সাদাকা, সহ যত ভালো কাজ এবং ইবাদাত করবো সব কাজ করবো একমাত্র এবং শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। অন্য কারোর জন্য বা অন্য কাউকে খুশী করার জন্য নয়। অন্যথায় সব ইবাদাত বৃথা।

বিশ্বাস করেন, নিয়াত যদি বিশুদ্ধ না হয়, তাহলে সারাজীবন ধরে সিজদাহ দিয়ে কপালে কালো দাগ করে ফেললেও কোনো লাভ নাই।

অনেকেই দেখি বাবা, মা, বিএফ, জিএফ, বস আত্নীয় স্বজন এর কথা রাখার জন্য বা তাদের খুশী করার জন্য বা দেখানোর জন্য নামাজ পড়েন,রোজা রাখেন।
আল্লাহর কসম ভাই, বোন কষ্ট করে নামাজ পড়ে, রোজা রেখে কোনো লাভ নাই যদি আপনার নিয়্যাত আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যাতিত অন্য কিছুর জন্য হয়।

তাই তাওবা ইস্তেগফার করার আগে সবচেয়ে জরুরি যেই জিনিস তা হচ্ছে আমাদের নিয়্যাত বিশুদ্ধ করা।

❒ তওবাঃ

রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক আদম সন্তান ত্রুটিশীল ও অপরাধী, আর অপরাধীদের মধ্যে উত্তম তারা যারা তওবা করে।’ (তিরমিজি)

আমরা সবাই কমবেশী অনেক পাপ করি, কিন্তু মাঝে মাঝে অনেক বড় পাপ করে ফেলি। তওবা করে আল্লাহর রাস্তায় ফিরে না আসলে যে পাপ গুলোর কোনো ক্ষমা হয়না।

বিশ্বনবী (সা.) নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও শুধু শোকরগুজারের জন্য দিনে শতবার পর্যন্ত তওবা করেছেন। রাসূল (সা.) বলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহ্ র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং দৈনিক সত্তরের অধিকবার আল্লাহর কাছে তওবা করি।’ (বুখারি)

আমরা তাওবা কিভাবে করবো?

তাওবার মুল কথা হলো, যে পাপ আমরা করে ফেলেছি সেটার জন্য অনুতপ্ত হওয়া,সেই পাপের জন্য আল্লাহ কাছে ক্ষমা চাওয়া, পুনরায় সেই পাপ না করা,এবং সেই পাপ কে মন থেকে ঘৃনা করা।

আগেই বলেছি তাওবার জন্য নিয়ত বিশুদ্ধ হতে হবে। মানে হচ্ছে সেটাও হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তাকে খুশী করার জন্য।

তাই আমরা নিয়ত করবো এভাবে,

"হে আল্লাহ্ আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্যই তাওবা করছি,আমার পাপের জন্য আমি অনুতপ্ত, আমি সেই পাপ কে ঘৃনা করি,তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও,আমি আর কখনো আর সেই পাপ করবোনা, আমাকে পাপ থেকে বিরত থাকতে সাহায্য করো"।

কোনো অপরাধ যদি হয় মানুষের হক নষ্ট সম্পর্কিত এ
ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহর কাছে তওবা করলেই হবে না বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে মাফ চাইতে হবে। যদি ওই ব্যক্তি মাফ না করেন তবে আল্লাহও মাফ করবেন না। আর যদি ওই ব্যক্তি মাফ করে দেন তবে আল্লাহও মাফ করে দেবেন।

বান্দাকে অবশ্যই আল্লাহর নাফরমানি ও মানুষের হক নষ্টসহ যাবতীয় পাপাচার থেকে ফিরে আসতে হবে। আর যথাযথ প্রক্রিয়ায় বান্দা ফিরে এলে আল্লাহপাক সব গুনাহ মাফ করে দেবেন। যেমন আল্লাহপাক বলেন, ‘হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ; তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইও না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা যুমার, আয়াত : ৫৩)

আল্লাহতায়ালা আরোও বলেন, ‘হে বনি আদম! তুমি যতক্ষণ আমাকে ডাকবে ও আমার আশা পোষণ করবে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব। তোমার থেকে যা কিছুই প্রকাশ পাক, এতে আমি কোনো পরোয়া করি না। হে বনি আদম! তোমার গুনাহ যদি ঊর্ধ্ব আকাশ পর্যন্ত পৌঁছায়, আর তুমি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে আমি সামান্য পরোয়া করি না। হে বনি আদম! তুমি যদি আমার কাছে দুনিয়া ভরা গুনাহ নিয়ে আস আর শিরকে লিপ্ত না হয়ে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ কর, আমি তোমার জন্য জমিন ভরা ক্ষমা নিয়ে উপস্থিত হব।’ (তিরমিজি)

তওবা করলে আল্লাহতায়ালা বান্দার ওপর অত্যন্ত খুশি হন। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তওবায় আল্লাহতায়ালা এই পরিমাণ খুশি হোন যে, যেমন ধর তোমাদের কেউ গরম মরুভূমিতে উট গাছের ডালে বেঁধে ঘুমিয়ে পড়ল। সে উটের সঙ্গে তার খাদ্য-পানীয়সহ সব আসবাব ছিল। ঘুম থেকে জেগে দেখল তার উটটি আগের স্থানে নেই। এদিক ওদিক খুঁজে কোথাও পাওয়া গেল না। যখন সে একেবারে নিরাশ হয়ে গেল। তখনই দেখল তার উটটি যথাস্থানে রয়েছে। এমন মুহূর্তে সে ব্যক্তি যতটুকু খুশি হবে, কোনো বান্দা তওবা করলে আল্লাহতায়ালা তারচেয়ে বেশি খুশি হন।’ (মুসলিম)

তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে এলে আল্লাহপাক কেবল গুনাহগুলোই মাফ করে দেন না, বরং আগের অপরাধগুলোকে সওয়াবে পরিণত করে দেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা তাওবা করে, ইমান আনে এবং ভালো কাজ করে, আল্লাহতায়ালা তাদের খারাপ কাজগুলোকে ভালো কাজে পরিণত করে দেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর যারা তওবা করে এবং নেক কাজ করে আল্লাহর প্রতি তাদের তাওবা-ই সত্যিকারের তাওবা।’ (সূরা ফুরকান, আয়াত : ৭০-৭১)।

তওবাকারীকে আল্লাহপাক জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আশা করা যায় তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ (তওবার বদৌলতে) মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত।’ (সূরা তাহরিম, আয়াত : ৮)

এক্ষেত্রে আর একটা কথা মনে রাখতে হবে কেবল মুখেমুখে তওবা বললে বা করলেই হবে না; বরং তওবা করতে হবে একনিষ্ঠভাবে।

কেননা আল্লাহতায়ালার নির্দেশ হল, ‘হে ইমানদার! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে তওবা (তওবাতুন নাসুহা) কর। (সূরা তাহরিম, আয়াত : ৮)

আমরা যখন সত্যি সত্যিই মন থেকে আমাদের পাপের জন্য অনুতপ্ত হবো, এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবো সেটাই হবে খাটি তওবা বা "তওবাতুন নাসুহা"

এমন টা যেনো না হয় আমরা ইচ্ছা করে বার বার একই পাপ করছি, আর মনে মনে ভাবছি, যে আল্লাহর কাছে তওবা করে নিবো,
তাহলে সেটা আল্লাহর সাথে গেম খেলার মতো হয়ে যাবে। এটা যেনো কখনোই না হয়।

কারন আল্লাহ্ আমাদের সবার মনের খবর জানেন।

এখন আসি, তাওবা করার পর শয়তানের ধোকায় যদি আবার সেই পাপ হয়ে যায়, তাহলে কি করবো।

শয়তান সব সময় আমাদের পেছনে লেগে থাকে আমাদের ধোকা দেয়ার জন্য। আমরা সেই ধোকায় পাপ করে ফেলতেই পারি। কিন্তু করার সাথে সাথে অনুতপ্ত হয়ে আবার নতুন করে তাওবা করতে হবে, আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে হবে নিজের ভুলের জন্য। এবং সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে পাপ থেকে বেচেঁ থাকার জন্য। এভাবে যতবার ভুল হবে ততবার তওবা করতে হবে।

আবার ও বলছি আল্লাহ্ আমাদের মনের গোপন কথা জানেন, এবং আমাদের নিয়ত সম্পর্কেও তিনি অবগত।

সুতরাং তওবার জন্য কোনো দিন, ক্ষন,সপ্তাহ, মাস বা বছরের অপেক্ষা করা না করে,অপরাধবোধ হলে তাওবা করে আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে হবে। যদি আমাদের নিয়ত বিশুদ্ধ হয়,এবং আমাদের তাওবা টা খাটি হয় তাহলে আল্লাহ্ র রহমতে আমরা আমাদের করা সব গুনাহ মাফের আশা করতে পারি, এবং আল্লাহর সৃষ্টি হিসবে নিজেদের আগমন কে সার্থক করে তুলতে পারি।
ইন শা আল্লাহ।

লেখাঃ তারেক আব্দুল্লাহ (আল্লাহ্‌ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!)

আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!

Post a comment

0 Comments