কষ্ট জীবনের কাছে যতটা অপছন্দের, আত্মার জন্য ততটাই উপকার


তিরমিযীতে আবু হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বর্ণিত একটি সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ যখন জান্নাত সৃষ্টি করলেন তখন তিনি জিবরীলকে সেখানে পাঠিয়ে বললেন, “দেখে এসো জান্নাত এবং জান্নাতের আরাম-আয়েশ যা আমি তাঁর অধিবাসীদের জন্য তৈরি করেছি”।
জিবরীল গিয়ে তা দেখে এলেন এবং আল্লাহ কে বললেন, “আপনার বড়ত্বের শপথ, যে-ই শুনবে সে-ই এতে প্রবেশ করবে (অর্থাৎ এতে প্রবেশ করতে যা করা দরকার তাঁর সবই করবে)।

তারপর আল্লাহ জান্নাতকে আদেশ দিলেন দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ ও অপছন্দনীয় জিনিস দিয়ে পরিবেষ্টিত হয়ে যেতে। তিনি জিবরীলকে বললেন, “ফিরে যাও এবং দেখে আসো সেই জান্নাত ও তার অধিবাসীদের জন্য আমি কী প্রস্তুত করে রেখেছি।” জিবরীল জান্নাতে ফিরে গিয়ে একে বিপদ আপদ ও অপছন্দনীয় জিনিস দিয়ে ঘেরা অবস্থায় পেলেন। তিনি ফিরে এসে আল্লাহকে বললেন, “আপনার বড়ত্বের শপথ, আমি ভয় করি যে কেউই এতে প্রবেশ করবেনা। (অর্থাৎ সে এটি এড়ানোর জন্য যা করা দরকার তা-ই করবে)”।

অতঃপর আল্লাহ জিবরীল কে বললেন, “জাহান্নামে যাও এবং দেখে এসো এর শাস্তিসমূহ যা আমি এর অধিবাসীদের জন্য তৈরি করেছি”। জিবরীল জাহান্নামের দিকে দেখলেন এবং তার কাছে তা অত্যন্ত ভয়ংকর লাগলো, তাই তিনি আল্লাহ কে বললেন, “আপনার বড়ত্বের শপথ, যে-ই এর কথা শুনবে সে-ই এটি থেকে বাঁচতে চাইবে”। তারপর আল্লাহ জাহান্নামকে আদেশ দিলেন কামনা ও বিলাসিতা দিয়ে পরিবেষ্টিত হয়ে যেতে এবং জিবরীলকে বললেন, “ওখানে ফিরে যাও”।

জিবরীল সেখানে গেলেন ও বললেন, “আপনার বড়ত্বের শপথ, কেউই এ থেকে বাঁচতে পারবেনা”।

আমাদের জীবন কী জান্নাত অভিমুখী নাকি জাহান্নাম – এই প্রশ্নের জবাব পেতে জীবনের দিকে লক্ষ্য করি।

যদি আপনি আল্লাহর ইবাদাত করেন আর আপনার জীবন কষ্ট আর অপছন্দনীয় জিনিস দ্বারা পূর্ণ থাকে, তবে সেটি আপনার জন্য ভালো লক্ষণ। মানুষ কি অপছন্দ করে?

সে অপছন্দ করে ভয়, ক্ষুধা, দারিদ্র, তৃষ্ণা, নিরাপত্তার অভাব, আশ্রয়ের অভাব, বন্দীত্ব, বঞ্চনা, আপনজনের বিচ্ছেদ, একাকীত্ব, অনিশ্চয়তা এবং এরকম আরো অনেক কিছু, যা দিয়ে জান্নাত ঘেরা। জীবনে এসবের উপস্থিতি নির্দেশ করে যে একজন মু’মিন জান্নাতের পথে আছে কি না।

এবার ভাবুন কোন জিনিসগুলো একজন ব্যক্তি তার জীবনে পেতে চায় বা ভালোবাসে?

সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, সুপ্রশস্ত বাড়ি, নিরাপত্তা, প্রচুর খাদ্য ও পানীয়, দামী কাপড়, প্রিয়জনের সান্নিধ্য – এরকম আরো অনেক কিছু। জাহান্নাম কিন্তু এসব দিয়েই ঘেরা। মু’মিনের জীবনের এসবের উপস্থিতি জানান দেয় সে ধ্বংসের পথে অভিমুখী কি না।

“এবং সেই দিন কাফিরদের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে, বলা হবে, ‘তোমরা পার্থিব জীবনে আনন্দ ফুর্তি করেছো, এবং তা উপভোগ করেছো, অতএব এই দিনে তোমাদের চরম লাঞ্ছনাকর শাস্তিতে ভূষিত করা হবে কারণ তোমরা পৃথিবীর বুকে অনধিকার মূলকভাবে অহংকারী ছিলে এবং নিশ্চয় তোমরা অবাধ্য।”

উমার বিন আল খাত্তাব, আব্দুর রাহমান বিন আউফ এবং অন্যেরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম এই আয়াতটি প্রায়ই উল্লেখ করতেন, এমনকি খুব সামান্য খাওয়া দেখে আনন্দিত হলে তখনও।

অতএব, যদি আল্লাহকে মান্য করতে চান, তাহলে আপনার মনের সাথে কথা বলুন এবং আপনার প্রবৃত্তি যা করতে আদেশ দেয় তার উল্টো কাজটি করুন।

— যদি আপনার প্রবৃত্তি আদেশ দেয়ে সালাত না পড়ে ঘুমাতে, উঠে পড়ে সালাত আদায় করুন।

— যদি আপনার প্রবৃত্তি কৃপণতার আদেশ দেয়, তাহলে আপনার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি খরচ করুন।

আল্লাহ সূরা আলে-ইমরানে বলেন, “তোমরা কখনও পুণ্য[1] লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের প্রিয় জিনিস হতে আল্লাহর পথে ব্যয় করেছ। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।” (আল ইমরান, আয়াত : ৯২)

[1] ‘পুণ্য’ বলতে এখানে বুঝানো হয়েছে, সৎকাজ অথবা জান্নাত। (ফাতহুল ক্বাদীর) হাদীসে বর্ণিত যে, যখন এই আয়াত নাযিল হয়, তখন আবূ ত্বালহা আনসারী (রাঃ) --যিনি মদীনার বিশিষ্ট সাহাবীদের একজন -- নবী করীম (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! বাইরুহা বাগানটি হল আমার কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয় বস্তু। সেটাকে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সাদাকা করছি। রসূল (সাঃ) বললেন, ‘‘সে তো বড়ই উপকারী সম্পদ। আমার মত হল, ওটাকে তুমি তোমার আত্মীয়দের মধ্যে বণ্টন করে দাও।’’ তাই রসূল (সাঃ)-এর পরামর্শ অনুযায়ী সেটাকে তিনি স্বীয় আত্মীয়-স্বজন এবং চাচাতো ভাইদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। (মুসনাদ আহমাদ) এইভাবে আরো অনেক সাহাবী তাঁদের প্রিয় জিনিস আল্লাহর পথে ব্যয় করেছেন। مِمَّا تُحِبُّوْنَ এ ‘মিন’ (হতে) শব্দ ‘তাবঈয’ তথা কিয়দংশ বুঝানোর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, পছন্দনীয় ও প্রিয় জিনিসের সবটাকেই ব্যয় করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। বরং তা থেকে কিয়দংশকে ব্যয় করতে বলা হয়েছে। কাজেই সাদাকা করলে ভাল জিনিসই করা উচিত। এটা হল সর্বশ্রেষ্ঠ ও পরিপূর্ণ মর্যাদা লাভ করার তরীকা। তবে এর অর্থ এও নয় যে, নিম্নমানের জিনিস অথবা স্বীয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিস কিংবা ব্যবহূত পুরাতন জিনিস সাদাকা করা যাবে না বা তার নেকী পাওয়া যাবে না। এই ধরনের জিনিসও সাদাকা করা জায়েয এবং তাতে নেকী অবশ্যই পাওয়া যাবে। তবে বেশী ফযীলত ও পূর্ণতা রয়েছে প্রিয় বস্তু ব্যয় করার মধ্যে।

[2] ভাল ও মন্দ যে জিনিসই তোমরা ব্যয় করবে আল্লাহ তা জানেন সেই অনুযায়ী প্রতিদানও তিনি দিবেন।

— যদি আপনার প্রবৃত্তি ঘরে সালাত পড়তে আদেশ দেয়, তবে মাসজিদে চলে যান।

— যদি আপনার প্রবৃত্তি আদেশ দেয়ে অসুস্থ মুসলিম ভাইকে দেখতে না গিয়ে ঘরে বসে আরাম করতে তো উঠে চলে যান এবং তাকে দেখে আসুন, কারণ আল্লাহকে আপনি তার সাথে পাবেন।

অতএব, নিজের জীবনকে নিয়ে ভাবুন এবং নিজেই নিজের বিচারক হোন। আল্লাহ যদি আপনার উপর বিলাসিতার উপর বিলাসিতা, সম্পদের উপর সম্পদ, আরামের উপর আরাম ঢেলে দেন, তার মানে কোনো একটা সমস্যা আছে আর এমন হওয়া আপনার জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়।

উপরন্তু, এমন প্রাচুর্যের ছড়াছড়ি যদি আপনি আল্লাহর প্রতি অবাধ্য ও তাঁর আদেশ সমূহের প্রতি উদাসীন থাকা অবস্থায় ঘটে, তবে এটি আপনার আসন্ন ধ্বংসের আলামত। বিলাসিতা ও আরাম-আয়েশ মানুষকে আল্লাহর ব্যাপারে বিস্মৃত করে এবং স্বীয় দায়িত্বের ব্যাপারে গাফেল করে।

অপরদিকে, আপনি সাধ্যমত আল্লাহর উপাসনা ও তাঁর আদেশ সমূহের প্রতি মনোযোগী হওয়া সত্ত্বেও যদি আপনার জীবন বিপদ-আপদ ও অপছন্দের জিনিসে ভরে যায়, তবে খুশী হোন। কারণ এটি একটি শুভ লক্ষণ যে আপনি জান্নাতের পথে আছেন।

বিপদ-আপদ মু’মিনকে আল্লাহর কথা স্মরণ করায় এবং আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর দিকে মুখ ফেরাতে সাহায্য করে। একটি বহুল প্রচলিত কথা হলো:

“কষ্ট জীবনের কাছে যতটা অপছন্দের, আত্মার জন্য ততটাই উপকারের আর আরাম জীবনের কাছে যতটা পছন্দের, আত্মার জন্য তা ততই ক্ষতির কারণ।
কাজেই, হে আল্লাহর পথের পথিক, দুঃখ করবেন না যখন আপনাকে নিম্ন মানের খাদ্য ও ছেঁড়া কাপড় পরতে দেয়া হয়, পরিবার আর প্রিয়জন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়।

দুঃখ করবেন না যদি দেখেন অন্যরা সম্পদ ও সন্তানে আপনাকে ছাড়িয়ে যায়, বরং খুশি হোন, কারণ, আপনি তো সেই জান্নাতের পথেই আছেন যা এতটা দুঃখ-কষ্ট দিয়ে আবৃত যে ফেরেশতা জিবরীল পর্যন্ত আশংকা করেছিলেন যে কেউই এতে প্রবেশ করতে সমর্থ হবে না।

১৩ শতকের বিখ্যাত ‘আলিম আল–‘ইযয্ বিন আব্দুস সালাম বলেন, “দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভোগ মানুষকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর দিকে ধাবিত করে, যেখানে সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি তাকে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে ঠেলে দেয়,
 যেমনটা আল্লাহ আল-কুরআনে বলেন,

“আর যখন মানুষকে কোন ক্লেশ স্পর্শ করে, তখন শুয়ে, বসে অথবা দাঁড়িয়েও আমাকে ডাকতে থাকে। অতঃপর যখন আমি তার সেই কষ্ট ওর নিকট হতে দূর করে দিই, তখন সে নিজের পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসে; যেন তাকে যে কষ্ট স্পর্শ করেছিল তা মোচন করার জন্য আমাকে ডাকেইনি;[1] এইভাবেই সীমালংঘনকারীদের কার্যকলাপ তাদের কাছে শোভনীয় করা হয়েছে। [2]”। [সূরাহ ইউনুস, আয়াত : ১২]

[1] এটা মানুষের ঐ অবস্থার বিবরণ, যা অধিকাংশ মানুষের অভ্যাস। বরং অনেক আল্লাহতে বিশ্বাসী মানুষও এই শিথিলতার শিকার হয়ে থাকে। আর তা এই যে, মসীবতের সময় খুব ‘আল্লাহ-আল্লাহ’ করা হয়, দু’আ করা হয়, তওবা-ইস্তিগফারের যথাযথ খেয়াল রাখা হয়। কিন্তু যখন আল্লাহ তাআলা মসীবতের সেই কঠিন সময় পার করে দেন, তখন আল্লাহর দরবারে দু’আ করা থেকে গাফেল হয়ে যায়। আর আল্লাহ তাআলা তাদের দু’আ কবুল করে তাদেরকে যে বালা-মসীবত থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার তওফীক তাদের ভাগ্যে জোটে না।

[2] এই আমল শোভন করা আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ অথবা অবকাশস্বরূপ হতে পারে। শয়তানের পক্ষ থেকে কুমন্ত্রণা দ্বারাও হতে পারে। আবার মানুষের ঐ আত্মার পক্ষ থেকেও হতে পারে, যে আত্মা মানুষকে নোংরা কাজে উদ্বুদ্ধ করে।

((يوسف-৫৩) إِنَّ النَّفْسَ لأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ বস্তুতঃ সীমালংঘনকারীরাই এর শিকার হয়। এখানে অর্থ এই দাঁড়ালো যে, দু’আ থেকে বিমুখতা, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা থেকে ঔদাস্য এবং প্রবৃত্তিপূজা ইত্যাদি কর্মকে তাদের জন্য সুশোভিত করে দেওয়া হয়েছে। (ফাতহুল কাদীর)

হাসান আল বাসরি (রহ.) বলেন, “তোমার উপর বিপদ আপতিত হলে সেটি ঘৃণা কোরো না, কেননা তুমি যা অপছন্দ করছ, সেটি হয়ত তোমার নাজাতের কারণ এবং যা তুমি পছন্দ করছ তা হয়তো তোমার ধ্বংসের কারণ।”

সবশেষে বর্ণিত আছে যে, আলী বিন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছেন, “হে আদম সন্তান! ধনী হওয়ার ব্যাপারে খুশী হয়ো না এবং দারিদ্রের ব্যাপারে দুঃখী হয়ো না। দুর্দশার সময়ে দুঃখ করোনা এবং সমৃদ্ধির ব্যাপারে আনন্দ কোরো না। কারণ স্বর্ণ যেভাবে আগুনে পরীক্ষিত হয়, মুত্তাক্বীরা তেমনি পরীক্ষিত হন দুঃখ-কষ্ট দ্বারা। কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না যদি না তুমি পছন্দের জিনিসকে ত্যাগ করার ক্ষমতা রাখো। ধৈর্যের সাথে ঘৃণিত জিনিসকে সহ্য করার ক্ষমতা রাখো এবং যা তোমার উপর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে তা পালনের সর্বাত্মক চেষ্টা কর।”
সমাপ্ত

লেখাঃ শাহ মোহাম্মদ তন্ময় (আল্লাহ্‌ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!)

আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ