চিনলেন না আপনি আঁধারটারে

চিনলেন না আপনি আঁধারটারে…

ধরেন আপনি সাদা কাপড় পরে বেরিয়েছেন কোথাও যাবার জন্য। কাপড়ে কাদা লেগেছে, টের পান নি। একটা লোক আপনাকে ডেকে বলল- ভাই আপনার জামায় কাদা।

আপনি ভাই খুব রেগে গেলেন। আমার জামায় কাদা! হতেই পারে না! আরেকদিন লোকটা আবার বলল আপনার জামায় কাদা লেগেছে, পরিষ্কার করুন। আপনি গা করলেন না। ভাবলন ঐ লোকের চোখের দোষ।

তৃতীয়দিন লোকটা জামা ধরে কাদাটা দেখিয়ে দিল। আপনি অপমান বোধ করলেন। লোকটাকে মারলেন ঘুষি।

আপনি একটাবার ভেবে দেখলেন না আপনার জামায় আসলেই কাদা লেগেছিল। ভাবলেন না লোকটা আপনার ভালোর জন্যই কথাটা বলেছিল।

জানেন ভাই, এই দুনিয়ায় আমরা মানুষ চিনতে বড্ড ভুল করি। আমাদের ভুলটা যে ধরিয়ে দেয় তাকে শত্রু ভাবি। ভাবি-মিছেমিছি আমার কাজে নাক গলানো কেন বাপু! এই বেশ ভালো আছি, খাচ্ছি-দাচ্ছি-ঘুমাচ্ছি। চুরি করছি না, কারো ক্ষতি করছি না। তবু কেউ কেন বলে দেবে আমার চিন্তায় ভুল আছে?

জানেন, আপনি যখন স্টেজে উঠে পারফর্ম করেন, হাজারো মানুষ হাততালি দেয়, আমি সেই হাততালি দেওয়াদের একজন হতে পারি না। আপনার গান যখন ইউটিউবে আপলোড হয়, আমি ‘লাইক’ দিতে পারি না । আপনি যখন গার্লফ্রেন্ডকে ট্যাগ করে রিলেশানশিপ স্ট্যাটাস দেন, আমি আপনার বন্ধুগুলোর মত কনগ্রাচুলেট করতে পারি না। আমার একটা দীর্ঘশ্বাস আসে। একটা দু’আ আসে।

ভাবছেন আপনার সাফল্যে আমি খুশি হই না কেন? এ কেমন বন্ধু তবে? ভুল ভাবছেন ভাই। আপনার সাফল্যে আমার চেয়ে বেশি খুশি খুব বেশি মানুষ হয় না। কিন্তু ভাই সমস্যা কী, জানেন? আপনি যেগুলোকে সাফল্য ভাবছেন আমি সেগুলোকে ভাবি না। আপনি টানেলের ভেতর যাকে আলো ভাবছেন, আমি দেখতে পাচ্ছি সেটা এগিয়ে আসা একটা দ্রুতগামী ট্রেন, লাইন থেকে সরে না দাঁড়ালে যা আপনাকে পিষ্ট করে ফেলবে।

শপথ সময়ের, মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। [সূরা ‘আসরঃ ১]

আমি আপনাকে সেই মহা ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য বলছি ভাই। আপনাকে এক মহাসত্যের কথা মনে করিয়ে দিতে বলছি ভাই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন তাঁর দৃষ্টান্ত হল এক ব্যক্তির মত যে আগুনের সামনে বসে আগুনে ঝাপ দিতে যাওয়া পতঙ্গদের আটকে যায়। পোকারা ভাবে এ তো আলো, ঝাপ দেয় আর পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

ভাই আমার, পোকাদের মত অবুঝ হোয়েন না। যাকে আপনি আলো ভাবছেন তা সাক্ষাত জ্বলন্ত আগুন। আজ যাকে আপনি জীবনের সব ভাবছেন, কাল আপনি এরই জন্য কাঁদবেন।

হুমায়ূন আহমেদের একটা বিখ্যাত নাটকে একটা কথা ছিল-“পৃথিবীতে খারাপ মানুষ অনেক আছে, খারাপ বাবা একজনও নেই”।

কথাটা সত্য না, জানেন? খারাপ বাবা আছে। খারাপ মা আছে। অনেক আছে।

যে মা সন্তানকে স্কুলের জন্য ভোরে তুলে দেন কিন্তু নামাজের জন্য ডাকেন না সে মা খারাপ মা। যে বাবা মেয়েকে নাচের ক্লাসে দিয়ে আসেন কিন্তু কুরআন শেখান না সে বাবা খারাপ বাবা। জানেন ভাই, এমন একদিন আসবে, যেদিন আপনার মা আপনাকে চিনবেন না। আপনার বাবা তার পিতৃত্বের দাবি অস্বীকার করবেন। সেদিন আপনার মা-বাবা কে নিজের শত্রু বানিয়ে ফেলিয়েন না ভাই।

ভাবছেন মা-বাবা আবার শত্রু হয় নাকি? নির্বোধের মত কথা বলছি? না ভাই। এ পৃথিবীর সবচাইতে পবিত্র আর সত্যবাদী মানুষটা, যাকে আমরা না দেখে আল্লাহ্‌র রাসূল বলে মেনেছি, তিনি আমাদের সতর্ক করে গেছেন। তিনি বলে গেছেন সেই ভয়াবহ মুহূর্তে প্রত্যেকে দুনিয়ার সমস্ত কিছু, এমনকি নিজের সন্তানকে জাহান্নামের আগুনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হলেও নিজে বাঁচতে চাইবে।

কল্পনা করেছেন সেদিন কেমন কঠিন হবে? সেদিন সন্তানেরা সাক্ষ্য দেবে মা-বাবার বিরুদ্ধে, বলবে- আল্লাহ্‌! আমার বাবা আমাকে নামাজ শেখায় নি, আমার মা আমার হাতে গিটার তুলে দিয়েছিল, আমাকে শাস্তি দেবার আগে তাঁদের শাস্তি দাও।

হায় রে ঠুনকো দুনিয়ার ভালোবাসা! হায় রে ঠুনকো দুনিয়ার ভালো চাওয়া!

এক মনীষী বলেছিলেন, মানুষ ঘুমিয়ে আছে। তার ঘুম ভাঙ্গবে মৃত্যুর পর।

হায় আমার ভাই!

আপনার বোহেমিয়ান জীবনের সুখপাত্র উপভোগের মন্ত্রণা নিয়ে আজ আপনি যাদের সাথে চলছেন, যাদের বন্ধুত্বের কাব্যকথা নিয়ে আপনি বার্থডে আর ফ্রেন্ডশিপ স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, বিশ্বাস করেন এরা কেউ আপনার বন্ধু না। যেদিন আপনি সত্য বুঝবেন, যেদিন হাতড়ে বেড়াবেন যৌবনের অমূল্য সময়ের পেখমমেলা সুখস্বপ্নের অবাস্তবতার রহস্যকে, সেদিন এরা কেউ আপনার পাপের ভাগ নেবে না। যাদের ছাড়া জীবনটা অর্থহীন লাগত, পুড়ে যাওয়াটা সিগারেটটাও শেয়ার করতেন যেই বন্ধুদের সাথে, সেদিন কেউ তোর যন্ত্রণাটুকু শেয়ার করবে না।

বন্ধুবর্গ সেদিন একে অপরের শত্রু হবে, তবে আল্লাহভীরুরা নয়। [সূরা আয যুখরুফ, ৬৭]

সেদিন মনে পড়বে কেউ আপনাকে বিরক্ত করত ভাই। কেউ আপনাকে মসজিদে নিয়ে যেতে চাইত। আপনি মুভি আর ক্ল্যাশ অব ক্ল্যানস ছেড়ে উঠতে চাইতেন না। সেদিন হয়তো বলবি-হায়! কেন আমায় টেনে হিঁচড়ে মসজিদে নিয়ে গেল না!

হায় আমার বোন!

নিজেকে কমনীয় করে একের পর আপলোড করা ফটোতে বয়ে যাওয়া লাইকবন্যার লিস্টের একজনও আপনার এই সুন্দর শরীরটা মাটিতে পচে গলে যাবার দিন আপনার পাশে থাকবে না।আপনার ছবিতে মিষ্টি কমেন্ট করে পেছনে তোকে নিয়ে কুৎসিত কথা বলে বেড়ানো এই ছেলেগুলো আপনার বন্ধু হতে পারে না বোন। আপনার স্কেচ করা ফটোকে যারা প্রশংসায় ভাসিয়ে দিচ্ছে তারা আপনার বন্ধু না। বন্ধু তো হত যদি দু হাত দিয়ে তোকে থামিয়ে দিত। বলত- এটা করিস না, এটা পাপের কাজ। একদিন ঠিকই মনে পড়বে বোন। মনে হবে-হায়! কেউ যদি আমাকে বাধা দিত! কেউ যদি বলত এটা অন্যায়। ভয় হয় সেদিন হয়তো এই আফসোস কোন কাজে আসবে না। আল্লাহ্‌ যেন তার আগেই বোঝার সামর্থ্য দেন।

কে কার হিতকামনা করে, কে কাকে বিপদে ঠেলে দেয়, আমরা বুঝি না। বুঝতে চাই ও না।

হাসান আল বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, তোমরা পৃথিবীতে ভাল মানুষদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে তৎপর হও, কারন এই সম্পর্কের কারণে হয়ত তোমরা আখিরাতে উপকৃত হতে পারবে।

তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো- কীভাবে?

তিনি বললেন, যখন জান্নাতিরা জান্নাতে অধিষ্ঠিত হয়ে যাবে তখন তারা পৃথিবীর ঘটনা স্মরণ করবে এবং তাদের পৃথিবীর বন্ধুদের কথা মনে পড়ে যাবে। তারা বলবে, আমি তো আমার সেই বন্ধুকে জান্নাতে দেখছিনা, কোথায় সে?

তখন বলা হবে, সে তো জাহান্নামে।

তখন সেই মু’মিন ব্যাক্তি আল্লাহ্‌র কাছে বলবেন, হে আল্লাহ্‌, আমার বন্ধুকে ছাড়া আমার কাছে জান্নাতের আনন্দ পরিপূর্ণ হচ্ছেনা।

অতঃপর আল্লাহ্‌ সুবহানু ওয়া তাআলা আদেশ করবেন অমুক ব্যাক্তিকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাতে।

তার বন্ধু জাহান্নাম থেকে রক্ষা পেল এই কারণে না যে সে তাহাজ্জুদ পড়ত, বা কুরআন পড়ত বা সাদাকাহ করত বা রোজা রাখত, বরং সে মুক্তি পেল কেবলই এই কারণে যে তার বন্ধু তার কথা স্মরণ করেছে। তার জান্নাতী বন্ধুর সম্মানের খাতিরে তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হল।

জাহান্নামীরা তখন অত্যন্ত অবাক হয়ে জানতে চাইবে কী কারনে তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হল, তার বাবা কি শহীদ? তার ভাই কি শহীদ? তার জন্য কি কোন ফেরেশতা বা নবী শাফায়াত করেছেন?

বলা হবে না, বরং তার বন্ধু জান্নাতে তার জন্য আল্লাহর কাছে অনুরোধ করেছে।

এই কথা শুনে জাহান্নামীরা আফসোস করে বলবে- হায় আজ আমাদের জন্য কোন শাফায়াতকারি নেই এবং আমাদের কোন সত্যিকারের বন্ধু নেই, যার উল্লেখ আছে এই আয়াতগুলোতেঃ

অতএব আমাদের কোন সুপারিশকারী নেই। এবং কোন সহৃদয় বন্ধু ও নেই। [সূরা আশ শু’আরাঃ ১০০-১০১]

বিশ্বাস করেন, আপনাকে আপনার রবের দিকে ফেরালে, আপনাকে আপনার পরিণতির কথা স্মরণ করালে আমার দুপয়সা লাভ নেই। কেউ আমাকে একশটা টাকা দেবে না, আমার সিজিও বাড়বে না। লাভ আপনার। আপনার জন্য এমন কিছু অপেক্ষা করছে যা কোনদিন আপনি কল্পনাও করেন নি।

হ্যাঁ, লাভ আমার আছে। দায়িত্ব পালন করতে পারার আনন্দ। আমার স্রষ্টার কাছে কিছু নিয়ে দাঁড়ানোর মত পুঁজি। আর আপনাকে পাপ ছাড়তে দেখার আনন্দ। এ আনন্দের তুলনা নেই। এ আনন্দ পেতে হলে ইসলামের স্বাদটা নিতে হবে।

একবার সাহসটা করে দেখেন না। জীবনটাকে আপনার স্রষ্টার ভালোবাসা দিয়ে সাজানোর চেষ্টা করে দেখেন না। দেখবেন জীবনের অর্থটা খুঁজে পেয়েছেন। মানুষের পছন্দ-অপছন্দের মিথ্যা দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীনতার স্বাদটা পেয়ে যাবেন। একবার চেষ্টাটা করেই দেখেন না।

আঁধারটাকে সরিয়ে দিয়ে আলোটাকে কাছে টেনে নিলে আপনি হারবেন না বন্ধু। বিশ্বাস করেন হারবেন না।

— ইতি

আপনার এক ভাই, এক বন্ধু, এক সুহৃদ।

লেখাঃ ফাতিন হাসনাত সা'দ (আল্লাহ্‌ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!)

আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!

Post a comment

0 Comments