করোনায় করনীয়

করোনায় করনীয়
করোনায় করনীয়

২০০৩ সাল, এসএসসি পরীক্ষার্থী আমি। সে সময় তো পিইসি-জেসসি ছিল না, এসএসসি ছিল জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা। দুয়া-দরুদ পড়ে, পরিবারের লোকজন সবাইকে সাথে করে পরীক্ষার্থীরা হল পর্যন্ত যেত। তো পরীক্ষার আগে আমি যেখানেই যেতাম, স্কুলের শিক্ষক থেকে শুরু করে আত্মী-স্বজন অথবা বাসার লোকজন প্রত্যেকের কাছ থেকেই পরীক্ষা সংক্রান্ত ফ্রি ফ্রি টিপস নিয়ে ফিরতাম। তার মধ্যে অন্যতম একটি টিপস ছিল "ভয় পেও না"।

শুরুতে আমার মাথায় ঢুকতো না, ভয় পাওয়ার প্রশ্ন আসছে কেন এখানে। ভয় পাওয়ার কী আছে? বার বার সবার মুখে এই কথা শুনতে শুনতে কখন যে সত্যি সত্যি ভয় পাওয়া শুরু করে দিলাম, নিজেরও তা জানা নেই।

পরীক্ষা শেষে বুঝলাম। আসলেই ভয়ের কিছু ছিল না৷ তবুও নাকি জীবনে প্রথমবারের মতো অজানা কিছুর মুখোমুখি হতে মানুষ ভয় পায়। আর সেজন্যই নাকি অভয় দিতে হয়।

মহামারি আকারে কোনো রোগ ছড়ালে দুই দল মানুষ আত্মপ্রকাশ করে। এক দল ভালোবেসে আতংক ছড়ায়, আরেক দল অভয় দিয়ে শোনায় আশার বাণী৷

আমি সম্ভবত দুই দলের মাঝামাঝিতে আছি। নিজে ভয় পাই না, অন্যকেও ভয় পেতে নিষেধ করি। আবার একই সাথে সতর্ক থাকা অথবা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার পক্ষেও কথা বলা প্রয়োজন মনে করি৷ তবে বেশি বেশি নিগেটিভিটি প্রচার করে অহেতুক আতংক ছড়ানোর ঘোর বিরোধী আমি।

সোশাল মিডিয়া, টিভি নিউজ অথবা ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা নিউজ পোর্টালগুলো এখন একটা খবরেই সয়লাব। অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পথে-ঘাটে, আড্ডায় সব জায়গায় প্রত্যেকেরই এই একটা বিষয়ে কিছু না কিছু বলার আছে। জ্বি পাঠক, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি নোভেল করোনা বা COVIT 19 এর কথাই বলছি। আর হ্যা, এখন যেহেতু এদেশেই সনাক্ত করা হয়েছে - ফ্রি ফ্রি টিপস দিতে আমিও বা বাদ যাই কেন! এই সুযোগে কিছু সওয়াব না হয় কামিয়ে নেওয়া যাক।

আর কথা না বাড়িয়ে চলুন শুরু করি৷

আপনার সর্দি লেগেছে? শুকনো কাশি? গলা ব্যথা? জ্বর?

হতে পারে আপনি নোভেল করোনায় আক্রান্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণ সর্দি-কাশির মতোই লক্ষন দেখা যায়৷ এবং আল্লাহর রহমতে সাধারণ চিকিৎসায় তা ভালোও হয়ে যায়।

সাথে শ্বাসকষ্ট? নিওমোনিয়া? শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে পড়ছে?

হতে পারে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, আপনার শরীরে রোগটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। তাই বলে মরে যাবেন ভেবে আতংকিত হওয়ার কিছুই নেই। এত কিছুর পরেও আপনি সুস্থ হতে পারেন।

ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মহামারী আকার ধারণ করলেও ৮০% রোগী সাধারণ চিকিৎসাতেই সম্পুর্ণ সুস্থ হয়ে পড়ছে।

মারা যাচ্ছে শুধু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম যাদের, অথবা যারা পূর্বেই বিভিন্ন বড় বড় রোগে আক্রান্ত।

মৃতের যে হার আপনাকে খবরে শোনানো/পড়ানো/দেখানো হচ্ছে - অন্যান্য রোগে প্রতিবছর এরচাইতে ঢের রোগী মৃত্যুবরণ করে থাকে। সাধারণ সিজনাল সর্দি-কাশিতেই বছরে ৪ লাখ মানুষ মারা যায়৷ অতএব, ভয়ের কিছু নেই।

আর মু'মিনরা তো একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করে না। বরং আমাদের আলহামদুলিল্লাহ বলে তাক্বদিরে যা আছে মেনে নেওয়া এবং একই সাথে প্রতিরোধে করনীয় সম্পর্কে জেনে নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ।

সুতরাং ভয় টয় বাদ দিয়ে আসুন আরো একবার জেনে নিই করোনায় করণীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং প্র‍্যাক্টিক্যাল টিপস -

১. সাবান ও পানি দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রয়োজনে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।

২. সর্দি-কাশি আছে এমন কারো কাছ থেকে অন্তত এক মিটার (৩ ফুট) দূরত্ব বজায় রেখে চলুন৷

৩. নিজের চোখ, নাক, মুখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন।

৪. সর্দি-কাশিতে রুমাল অথবা টিস্যু ব্যবহার করুন৷ যেখানে সেখানে ব্যবহৃত টিস্যু ফেলবেন না। রুমাল/টিস্যু না থাকলে সর্দি-কাশির সময় হাতের বাহু দিয়ে মুখ/নাক ঢেকে রাখুন।

৫. নিজের অথবা পরিবারের কারো জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট হলে বাসা থেকে বের হবেন না। আইইডিসিআরে ফোনে যোগাযোগ করুন। নিচের নম্বরগুলো মোবাইলে সেইভ করে রাখুন:

☎ +8801937000011
☎ +8801937110011
☎ +8801927711784
☎ +8801927711785

৬. কুকুর-বিড়াল অথবা পোষা প্রাণি থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে - এমন কোনো প্রমাণ এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কোন প্রাণি থেকে এই ভাইরাস আসে তা-ও এখনো জানা যায়নি। তবে যেহেতু করোনাভাইরাস প্রাণি থেকেই আসে; সেইফ থাকার জন্য কাঁচা মাছ-মাংস, কাঁচা দুধ, কাঁচা যে কোনো খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

৭. জনসমাগম থেকে বেঁচে থাকুন। তবে ভাইয়েরা জামাতে সলাত মিস দিবেন না ভুলেও৷ দরকার হলে মাস্ক ব্যবহার করুন। তাও আল্লাহর পরীক্ষায় হেরে যাবেন, ইবাদাতে ঘাটতি হয় এমন কিছু করবেন না। তাকদ্বিরে থাকলে কেউ ঠেকাতে পারবে না। আর যদি 'আলেমগণ এব্যাপারে সর্বসম্মতিক্রমে নির্দেশ জারি করেন, তাহলে তো ভিন্ন কথা।

৮. বেশি বেশি ইস্তিগফার আর দুয়া করুন। সকাল সন্ধ্যার জিকির আযকার নিয়মিত পড়ুন। আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখুন। ধৈর্য ধরুন। আপনি আক্রান্ত হলেও সুস্থ হয়ে পড়বেন ইনশাআল্লাহ - এই বিশ্বাস রাখুন।

৯. নিচের দুয়াটি বেশি বেশি পড়ুন, বাসার সবাইকে পড়তে উদ্বুদ্ধ করুন। সম্ভব হলে বড় করে লিখে দেয়ালে লাগিয়ে রাখতে পারেন।

اَللّهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَالْجُنُوْنِ وَالْجُذَامِ وَمِنْ سَيِّءِ الأَسْقَامِ.

অর্থ: "হে আল্লাহ! অবশ্যই আমি তোমার নিকট ধবল, উন্মাদ, কুষ্ঠরোগ এবং সকল প্রকার কঠিন ব্যাধি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" [সুনানে আবু দাউদ: ১৫৫৪]

১০. সোশাল মিডিয়াতে যেখানে যা পান যাচাই না করে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন৷ কমন সেন্স ব্যবহার করুন। এই লেখায় আমার দেওয়া প্রত্যেকটা তথ্য যাচাই করা এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত৷ কাজেই চোখ বন্ধ করে(আক্ষরিক অর্থে নয়) পড়ে যেতে পারেন।

একটা হাদিস দিয়ে শেষ করছি৷ এখানে প্লেগের কথা বলা হলেও যে কোনো মহামারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য -

আয়িশাহ (রাযিআল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্লেগ রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে, উত্তরে তিনি বলেন - ‘’এটি এক ধরনের আযাব। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের প্রতি ইচ্ছা করেন, তাঁদের উপর তা প্রেরণ করেন। আর আল্লাহ তায়ালা তাঁর মু’মিন বান্দাগনের উপর তা রহমত করে দিয়েছেন। অতএব কোনো ব্যক্তি যখন প্লেগ রোগে আক্রান্ত জায়গায় সাওয়াবের আশায় ধৈর্যধারণ করে অবস্থান করে এবং অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহ তাকদীরে যা লিখে রেখেছেন তা-ই হবে; এছাড়া আর কোনো বিপদ তার উপর আসবে না - তাহলে সে একজন শহীদের সমান সাওয়াব পাবে।’’ [বুখারী ৩৪৭৪, ৫৭৩৪, ৬৬১৯]

ভয় পেলে বিপদ কাটে না, বরং ভয় আরো নতুন বিপদ টেনে আনে৷ বিপদ কাটে সতর্কতায়, জানা এবং মানাতে৷ আল্লাহ আমাদের বিপদ আপদে ধৈর্য বাড়িয়ে দিন, অহেতুক ভয় দূর করে দিন। আমীন।

• COVIT 19 সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য জানতে:
https://tinyurl.com/u4pepnl

• কিছু ভুল তথ্য, যা আপনি সত্য ভেবে শেয়ার করছিলেন:
https://tinyurl.com/uc767am

• কখন এবং কীভাবে মাস্ক ব্যবহার করবেন:
https://tinyurl.com/wsygbv7

• সর্বশেষ নির্ভরযোগ্য খবর জানতে ফেবু স্ক্রল না করে চোখ রাখতে পারেন এখানে:
https://tinyurl.com/rry2d9f

লেখাঃ সিহিন্তা শরীফা (আল্লাহ্‌ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!)

আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!

Post a comment

0 Comments