একজন মেয়েকে জীবনে অসংখ্যবার ‘না’ বলতে হয়


একজন মেয়েকে জীবনে অসংখ্যবার ‘না’ বলতে হয়। না বলতে পারাটা কেবল একটা ভালো গুণ-ই না, মেয়েদের রক্ষাকবচ। একজন মেয়ে যদি ‘না’ বলতে না পারে, তাহলে তার জীবনটা পুতুলের মতো হয়ে যায়। বাচ্চারা যেমন পুতুল নিয়ে ইচ্ছেমতো খেলা করে, না বলতে না পারা মেয়েকে নিয়ে তখন এক বা একাধিক ‘বাচ্চা’ খেলা শুরু করে!

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রেমের প্রস্তাবগুলো ছেলেরাই করে। হতে পারে সেটা ৬০%, ৭০% বা ৮০%। একজন ছেলে তার সারা জীবনে যতোগুলো প্রেমের প্রস্তাব পায়, একজন মেয়ে তার স্কুল জীবনে তারচেয়েও বেশি পায়। স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি পড়ুয়া এরকম একজন মেয়ে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যে জীবনে একবারও প্রেমের প্রস্তাব পায়নি। হতে পারে সেই প্রস্তাবটি সামনাসামনি বা আড়াল থেকে।

একজন বিবাহিত নারীর আশেপাশেও অনেকে ঘুরঘুর করে। ঈগলের মতো কেউ কেউ সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। একজন মেয়েকে দৃঢ়তার সাথে এসকল প্রস্তাবে (কু-প্রস্তাব) ‘না’ বলতে হয়।

এমনকি জীবনসঙ্গী বেছে নেবার ক্ষেত্রে তাকে যেমন ‘হ্যাঁ’ বলতে হয়, তেমনি ‘না’ ও বলতে হয়। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবার সময় সে যে কেবল রাজী (হ্যাঁ) হবে, এমন না। ‘আমি রাজী নই’ এটা বলার অধিকারও তার আছে।

একবার এক যুবতী রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে এসে বললো, আমার বাবা আমাকে তার ভাতিজার সাথে বিয়ে দিয়েছেন (মেয়েটির মতামত নেয়া হয়নি)। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যুবতীর কথা শুনে বিয়ে অটুট রাখবে কি রাখবে না এই সিদ্ধান্ত তার উপর ছেড়ে দেন। যুবতী চাইলে বিয়েটা ভেঙ্গে দিতে পারেন, অথবা বিয়ে বহাল রাখতে পারেন। রাসূলের (সাঃ) পারমিশন পেয়ে যুবতী বললেন, “আমি বিয়েটা বহাল রাখলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিলো (বাকি) মেয়েদেরকে জানানো, তাদের বিয়ের ব্যাপারে বাবাদের কোনো এখতিয়ার নেই।” (সুনানে ইবনে মাজাহঃ ১৮৭৪)

প্রেমের প্রস্তাবকারী ছেলেকে, সুযোগ সন্ধানী পুরুষকে ‘না’ বলতে না পারলে একজন মেয়ে/নারী তাদের হাতের পুতুল হয়ে যায়। একজন মেয়ের ব্যক্তিত্ব নির্ভর করে তার ‘না’ বলতে পারার ক্ষমতার উপর। ‘না’ বলায় নমনীয়তা যতো বেশি, বিপদের সম্ভাবনাও ততো বেশি। ‘না’ বলার সময় যদি কঠোরতা না থাকে, সেই ‘না’ বলাটা তখন দূর্বলতা হয়ে যায়। মেয়েরা ‘না’ বলার সময় যদি দৃঢ়তা না দেখায় তাদের ‘না’ বলাটা তখন - ‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ’ শিরোনামে প্রচারিত হয়।

স্ট্রেইট-কাট ‘না’ বলে দেবার একটা উদাহরণ আমাকে অবাক করে। আমি বিস্মিত হই, একজন মেয়ে তার আবেগের ব্যাপারে কতোটা দৃঢ় থাকলে এরকম একজন মানুষের কথায় ‘না’ বলতে পারেন।

মুগীস নামের এক দাসের সাথে বারীরা নামের এক দাসীর বিয়ে হয়। মুগীস তাঁর স্ত্রী বারীরাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। তাঁদের ঘরে এক ছেলে/মেয়ে সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু, কোনো কারণে বারীরা স্বামীর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না। দাসত্ব থেকে মুক্তি পাবার পর বারীরা স্বামীকে ছেড়ে চলে যান। বারীরার চলে যাওয়াকে মুগীস কোনোভাবেই মানতে পারেননি। তিনি কেঁদে কেঁদে বারীরার পেছনে ঘুরতেন। তাঁর আকুতিগুলো হয়তো এমন হতো- ‘বারীরা, আমাকে ছেড়ে চলে যেও না!’

চিন্তা করুন, একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ রাস্তায় রাস্তায় স্ত্রীকে ফিরে পাবার জন্য কেঁদে কেঁদে ঘুরছেন, চোখের পানিতে তাঁর দাঁড়ি ভিজে যাচ্ছে! রক্ষণশীল সমাজে এমন দৃশ্য দেখলে মানুষ দুই ধরণের মন্তব্য করতো। মুগীসকে তিরস্কার করতো এই বলে, ‘আশ্চর্য! তুমি একজন পুরুষ মানুষ। তুমি কি-না স্ত্রীর জন্য পথে পথে ঘুরছো, পাগলের মতো কাঁদছো!’ মুগীসের এই অবস্থার জন্য বারীরাকেও দোষারোপ করা হতো, ‘তোমার হৃদয় কি পাথর? একটা মানুষের কান্না দেখেও কি তোমার হৃদয় গলে না?’

স্ত্রীর বিরহে পাগলপ্রায় মুগীসকে দেখতে পেলেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)। তাঁর সাথে থাকা ইবনে আব্বাসকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, “আব্বাস! বারীরার প্রতি মুগীসের ভালোবাসা আর মুগীসের প্রতি বারীরার অনাসক্তি দেখে তুমি কি অবাক হচ্ছো না?” মুগীসের বিরহবেদনা দেখে তাঁর প্রতি রাসূলের (সাঃ) মায়া জন্মালো। তিনি বারীরাকে বললেন, “(বারীরা) তুমি যদি তাঁর কাছে আবার ফিরে যেতে!”

একজন মুসলমান রাসূলের কোনো নির্দেশ অমান্য করতে পারে না। বারীরা জানতে চাইলেন, এই কথাটি রাসূলের (সাঃ) নির্দেশ নাকি সুপারিশ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “আমি কেবল সুপারিশ করছি (অর্থাৎ, আমার কথা তুমি গ্রহণ করবে কি করবে না সেটা তোমার এখতিয়ার)।” এটা শুনে বারীরা বললেন, “আমি তাঁকে (মুগীস) আর চাই না!” (সহীহ বুখারীঃ ৫২৮৩)

রাসূলের (সাঃ) সুপারিশ স্বত্বেও একজন নারী তাঁর (সাঃ) মুখের উপর ‘না’ বলে দিচ্ছে! নিজের আবেগ, পছন্দ-অপছন্দের বেলায় একজন নারীর ‘না’ বলাকে তুচ্ছ করে দেখা হয়নি। মেয়েদের এই ‘না’ বলাটা কেবল তার মত প্রকাশের স্বাধীনতাই নয়, হারাম সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া না-হওয়া এমনকি সতীত্ব রক্ষার জন্য তার অপশন- সে ‘না’ বলবে কি বলবে না।

মেয়েদের ‘না’ বলা মানে হতে হবে - No means no. পাপাচারে লিপ্ত হবার প্রস্তাবগুলোতে ‘না’ মানে- এখনও না এবং কখনো না। এই ‘না’ বলাতে কোনো কোমলতা নেই, আছে কাঠিন্য, আছে দৃঢ়তা।

লেখাঃ আরিফুল ইসলাম (আল্লাহ্ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!)

আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ