মুস'আব (রা.) ইসলাম গ্রহনের গল্পটি কি ছিল?


মুস'আব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু

চির উজ্জ্বল এক নক্ষত্র, এক মুগ্ধতার নাম। এই সাহাবী (রা.) কথা যখন প্রথম শুনি এত অবাক হয়েছি, আল্লাহু আকবর! ইসলামের জন্য কতোটা সেক্রিফাইজ করা যায় এবং কতোটা আন্তরিকতা সেই সেক্রিফাইজে উনার ঘটনা পড়লে তা অনুভব করা যায়। তিনিই সেই যুবক যিনি ছিলেন মক্কার সবচেয়ে প্রখ্যাত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করা, সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জামা পরিধানকারী এবং সবচেয়ে দামী ও সুন্দর সুগন্ধি ব্যবহারকারী। তিনি যে সুগন্ধি ব্যবহার করে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেন, সেই সুগন্ধির সুভাষ অনেকক্ষণ রাস্তায় থেকে যেতো। মানুষ বুঝতে পারতো, এই রাস্তা দিয়ে একটু আগে মুস'আব হেঁটে গেছেন।

স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সম্পর্কে বলেন, "মক্কায় মুস'আবের চেয়ে সুদর্শন আর উৎকৃষ্ট পোশাকধারী আর কেউ ছিলো না।"

সেই মুস'আব (রা.) ইসলাম গ্রহনের গল্পটি কি ছিল?

দারুল আরকাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেখানে কালিমার দাওয়াত দেওয়া শুরু করেছিলেন। সেখানে নিয়মিত মিটিং হতো। সেই দারুল আরকামে একদিন পৌঁছে গেলেন মুস'আব ইবনে উমাইর (রা.)। সেখানে তাঁর দেখা হলো রাসূলুল্লাহর ﷺ সাথে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন কুরআনের আয়াত পাঠ করছিলেন! সেই এক সাক্ষাতে রাসূল ﷺ মুখে কুরআনের বানী শুনে মুস'আব ইবনে উমাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন।

সেই প্রথম দিকে যখন ইসলাম গ্রহণ করলে অনেক অত্যাচার সহ্য করতে হতো, তখন মুস'আব রাঃ উপরে নেমে আসা কঠিন নির্যাতনেও যা তাঁর মা মা খুন্নাস বিনতে মালিক নিজেই চালালো তাঁর উপর, অথচ তিনি ছিলেন অটল, ঈমানের উপর স্থির। ইসলাম ত্যাগের জন্য তাঁর মায়ের অত্যাচার, চাপ প্রয়োগে তিনি কখনোই তাঁর ইসলামের প্রতি ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমালেন না।

শৃঙ্খল অতিক্রম করে তিনি হলেন প্রথম বার্তাবাহক। তিনি মদিনায় গেলেন প্রধান বার্তাবাহক হিসেবে এবং সেখানের লোকদেরকে দ্বীনের দাওয়াত দিচ্ছিলেন। এমনি একদিন মদিনার প্রধান নেতাদের একজন নাম উসাইদ রেগে অস্থির হয়ে উপস্থিত হলেন মুস'আব (রা.) সামনে এবং রেগে, হুমকি দিলেন যদি প্রাণের ভয় থাকে তুমি চলে যাও এখান থেকে। মুস'আব (রা.) অত্যান্ত বুদ্ধিমত্তার সহিত ধীরেসুস্থে, শান্ত কন্ঠে বললেন আমার কথা শুনুন। আপনি উত্তেজিত হবেন না। আমার কথা যদি আপনার ভালো লাগে তাহলে আপনি মানবেন, না হলে আমরা চলে যাবো।

অতঃপর সেই নেতা বসলেন এনং মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলেন তাঁর কথা। মুস'আব রাঃ তখন কুরআনের আয়াত পাঠ করছিলেন এবং সেই নেতার রাগে লাল মুখে আস্তে আস্তে হাসি ফুটে উঠছিল। যখন মুস'আব রাঃ শেষ করলেন, সেই নেতা অতি আশ্চর্যজনক ভাবে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন। এবং তিনি যেহেতু নেতা ছিলেন সেই গোত্রের তাঁর ইসলাম গ্রহনের পর সেই গোত্রের অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলো। সুবহানআল্লাহ! এমনি বুদ্ধিদীপ্ত এবং সাহসিক ছিলেন ইসলামের প্রথম বার্তাবাহক মুস'আব ইবনে উমাইর (রা.)।

এই সেই মুস'আব রাঃ যিনি বিলাসবহুল জীবন ত্যাগ করে তাঁর মায়ের শৃঙ্খল ভেঙে একমাত্র ইসলামের জন্য অত্যন্ত দারিদ্র্য জীবন বেছে নিয়েছিলেন।

একবার মুস'আব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে তাকে দেখে সাহাবীরা চোখ নামিয়ে ফেলেন, কেউ কেউ কান্না শুরু করেন। কারণ তাঁর পরনে ছিলো তালি দেওয়া এক জীর্ণ জোব্বা। তাকে এই অবস্থায় দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "...মুস'আব এসব কিছু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করে এসেছে এবং সে রাসূলের কাজে নিবেদিত করেছে।"

বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি বীরত্বের সাথে নিজের সর্বস্ব দিয়ে লড়াই করেছিলেন। উহুদ যুদ্ধের দিন মুস'আব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু পান ইসলামের পতাকা বহন করার মহান দায়িত্ব। যুদ্ধের ময়দানে যখন গুজব রটলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাহাদত বরণ করেছেন তখন অনেক সাহাবী যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকলেন। কিন্তু মুস'আব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু যুদ্ধ চালিয়ে যেতে লাগলেন আর ঘোষণা করতে লাগলেন, 'ওয়ামা মুহাম্মাদুন ইল্লা রাসূল, কাদ খালাত মিন কাবলিহির রাসূল' - মুহাম্মদ একজন রাসূল ছাড়া কিছুই নন, তাঁর পূর্বে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন।

কাফিররা তাঁর ডান হাত কেটে ফেললে তিনি বাম হাতে পতাকা তুলে ধরেন। তাঁর বাম হাতটি কেটে ফেললে তিনি দুই হাতের বাহুর মাঝখানে ইসলামের ঝাণ্ডা তুলে ধরেন। এক পর্যায়ে একটা তীর এসে তাকে আঘাত করে। তীরের আঘাতে তিনি শহীদ হন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজীউন)

যুদ্ধ শেষে যখন লাশগুলো দাফনের ব্যবস্থা করা হচ্ছিলো, তখন মুস'আব (রাদিয়াল্লাহু আনহুর) জন্য ছিলো মাত্র এক টুকরো কাপড়। যে কাপড় দিয়ে মাথা ঢাকলে পা খালি থেকে যায়, পা ঢাকলে মাথা খালি থেকে যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ টুকরো কাপড় দিয়ে তাঁর মাথা আর 'ইখলিস' নামক ঘাস দিয়ে পা ঢেকে দিতে বলেন।

তিনি কাঁদতে কাঁদতে তেলাওয়াত করেন:

مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عٰهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ ۖ فَمِنْهُم مَّن قَضٰى نَحْبَهُۥ وَمِنْهُم مَّن يَنتَظِرُ ۖ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا

"মুমিনদের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত তাদের প্রতিশ্রুতি সত্যে বাস্তবায়ন করেছে। তাদের কেউ কেউ [যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে] তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছে, আবার কেউ কেউ [শাহাদাত বরণের] প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা (প্রতিশ্রুতিতে) কোন পরিবর্তনই করেনি।" [সূরাহ আহযাব, আয়াত : ৩৩]

তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা দেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি এরাই হলো শহীদ। তোমরা আসো, তাদের দেখে যাও। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, কিয়ামতের আগ পর্যন্ত যারাই তাদেরকে সালাম দেবে, তাদেরকে তারা সালামের উত্তর প্রদান করবে।"

আসসালামু আলাইকুম ইয়া মুস'আব,
আসসালামু আলাইকুম মা'শার আশ-শুহাদা।

এই মুস'আব ইবনে উমাইর রাঃ এর সীমাহীন আত্মত্যাগের কথা আমরা কয়জন স্মরণ করি! ইসলামের জন্য আজ আমরা সেক্রিফাইজ করতে প্রস্তুত নই, প্রস্তুত দুনিয়ার জন্য ইসলামের বিধিবিধানের সাথে কম্প্রোমাইজ করতে। নিজেরাও জানিনা সাহাবী রাঃ ঈমানদীপ্ত জীবন, জানলেও আমল করি না। আমাদের বাচ্চাদেরও শিখাই না। অথচ আজ এই উম্মাহর জন্য দরকার এমন এমন মা,বাবার যারা সন্তানদেরকে তাদের নক্ষত্রদের, রিয়েল হিরোদের এমন সাহসী জীবন সম্পর্কে জানাবে, দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে আখিরাতের আশায় নিজ সন্তানদেরকে দ্বীনের কাজে লাগাবে, এক একজন বীর যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলবে।

আল্লাহ্‌ আমাদেরকে মাফ করুন এবং সাহাবীদের (রা.) পথ অনুসরণ করে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সমাপ্ত
লেখাঃ সায়মা সাজ্জাদ মৌসি (আল্লাহ্‌ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!)

আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ