যারা অদেখা বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে


আমরা এই কথাটা আজকাল খুব শুনছি যে, “ভাইরাসকে ভয় করো না! ভাইরাসের রবকে ভয় করো!" খুব অভিয়াস একটা কথা, কিন্তু প্রকান্ড এই কথার ভার!

একটা ক্ষুদ্র ভাইরাসকে ভয় করে আমরা রাতারাতি আমাদের জীবন-যাত্রার প্রত্যেকটা দিক চোখের পলকেই পাল্টে ফেলতে পারছি। কিন্তু সেই ভাইরাসের প্রভুর জন্যে নিজেকে পরিবর্তন করতে সারাজীবন পার হয়ে যায়? আত্মা গলা পর্যন্ত উঠে আসে তাও আমরা চেইঞ্জ হতে পারিনা! এরকম কেন হয়?

একটা বড় কারণ হচ্ছেঃ জান্নাত, জাহান্নাম আমরা দুই চোখে দেখতে পারিনা। আল্লাহ তালার অবয়ব স্বচক্ষে আমরা দেখতে পাইনা। সবার সামনে যদি জান্নাত আর জাহান্নামকে শিকল দিয়ে টেনে এনে উপস্থিত করা হতো - তাহলে দুই সেকেন্ড লাগতো সবার নামাজ শুরু করতে, হিজাব ধরতে! যদি আল্লাহ আর ফেরেশতাদের কার্যকলাপ আমরা চাক্ষুষ দেখতে পারতাম তাহলে ছোট ছোট বিষয় নিয়ে মারামারি, গীবত, নাটক-সিনেমা বাদ দিয়ে সিজদায় পড়ে থাকতাম সারাক্ষণ। মুহূর্তেই খাঁটি পরহেজগার হত সবাই!

কিন্তু অদেখার জগত অদেখাই থেকে যাবে। এই দুনিয়াতে অদেখার জগতের দৃশ্য আমাদের দেখার কথা না। আর এই অদেখাকে না দেখে বিশ্বাস করতে পারাটাই আসল পরীক্ষা। এগুলো দেখিয়ে দিলে তো আর এখানে আর পরীক্ষার কিছুই থাকলো না। মুহূর্তেই সবাই মুমিন! কিন্তু যারা দেখতে না পেয়েও এই অদেখা বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে নিজেদের জীবনে সেটা গুছিয়ে নিতে পেরেছে, তারাই আল্লাহর তরফ থেকে সুপথ পেয়েছে এবং সফল হয়েছে! (১) মু'মিনরা স্বচক্ষে দেখতে না পেলেও তাদের জীবনে আল্লাহর উপস্থিতি টের পায় প্রতিটা পদে পদে। তাদের পরিষ্কার অন্তর দিয়ে তারা আল্লাহর চাক্ষুষ সাইনগুলিকে চিহ্নিত করতে পারে। সত্যের প্রমাণ পেয়ে অন্তরে সুকুন/প্রশান্তি পায়। এই ব্যপারটা বিশ্বাসী ছাড়া আর কাউকে বুঝানো কঠিন!

সুবহানআল্লাহ! দুনিয়ার কোনো ক্ষতি থেকে বাঁচতে আমরা কত সচেতন! মানুষ চাকরিতে যাচ্ছেনা, খাওয়া কমিয়ে দিচ্ছে, দিনের পর দিন বাসায় নিজেকে বন্দী করে রাখছে, দিনে ৭ বার করে হাত ধুচ্ছে! কিছুতেই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কষ্ট পেয়ে ধুঁকে ধুঁকে আমরা মরতে চাই না! অথচ অনায়াসে এই দেহটাকে আগুনে পুড়িয়ে গলিয়ে দিবার মতো কাজ করে যাচ্ছি প্রতিদিন! ওই যে ভাইরাসের শাস্তি চাক্ষুস দেখতে পারছি। কিন্তু জাহান্নামের আগুন তো নিজের চোখে দেখিনা! এটাই পরীক্ষা। এখানেই আমাদের ধরা খাওয়া।

এমনকি আল্লাহকে ভালোবেসে যারা আল্লাহর পথে থাকার চেষ্টা করি, আমরাও খুব ভুলে যাই এই মহাসত্যের কথা! এজন্যে রসূল(ﷺ) এর খুব সুন্দর একটা দুয়া আছে। তিনি ﷺ বলতেন,

حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، قَالَ حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ أَبِي مُسْلِمٍ، عَنْ طَاوُسٍ، سَمِعَ ابْنَ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا قَامَ مِنَ اللَّيْلِ يَتَهَجَّدُ قَالَ ‏"‏ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ قَيِّمُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ وَلَكَ الْحَمْدُ، لَكَ مُلْكُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ، وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ نُورُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ، وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ الْحَقُّ، وَوَعْدُكَ الْحَقُّ، وَلِقَاؤُكَ حَقٌّ، وَقَوْلُكَ حَقٌّ، وَالْجَنَّةُ حَقٌّ، وَالنَّارُ حَقٌّ، وَالنَّبِيُّونَ حَقٌّ، وَمُحَمَّدٌ صلى الله عليه وسلم حَقٌّ، وَالسَّاعَةُ حَقٌّ، اللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ، وَإِلَيْكَ أَنَبْتُ، وَبِكَ خَاصَمْتُ، وَإِلَيْكَ حَاكَمْتُ، فَاغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَّرْتُ، وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ، أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ ـ أَوْ لاَ إِلَهَ غَيْرُكَ ـ ‏"‏‏.‏ قَالَ سُفْيَانُ وَزَادَ عَبْدُ الْكَرِيمِ أَبُو أُمَيَّةَ ‏"‏ وَلاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ ‏"‏‏.‏ قَالَ سُفْيَانُ قَالَ سُلَيْمَانُ بْنُ أَبِي مُسْلِمٍ سَمِعَهُ مِنْ طَاوُسٍ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم‏.‏

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

তিনি বলেন, আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাতে তাহাজ্জুদের উদ্দেশে যখন দাঁড়াতেন, তখন দু’আ পড়তেন- “হে আল্লাহ্‌! আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা, আপনি আসমান যমীন ও এ দু’য়ের মাঝে বিদ্যমান সব কিছুর নিয়ামক এবং আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আসমান যমীন এবং তাদের মাঝে বিদ্যমান সব কিছুর কর্তৃত্ব আপনারই। আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনি আসমান যমীনের নূর। আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনি আকাশ ও যমীনের মালিক, আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনিই চির সত্য। আপনার ওয়াদা চির সত্য; আপনার সাক্ষাৎ সত্য; আপনার বাণী সত্য; জান্নাত সত্য; জাহান্নাম সত্য; নবীগণ সত্য; মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সত্য, কিয়ামত সত্য। ইয়া আল্লাহ্‌! আপনার নিকটই আমি আত্মসমর্পণ করলাম; আপনার প্রতি ঈমান আনলাম; আপনার উপরেই তাওয়াক্‌কুল করলাম, আপনার দিকেই রুজূ’ করলাম; আপনার (সন্তুষ্টির জন্যই) শত্রুতায় লিপ্ত হলাম, আপনাকেই বিচারক মেনে নিলাম। তাই আপনি আমার পূর্বাপর ও প্রকাশ্য গোপন সব অপরাধ ক্ষমা করুন। আপনিই অগ্র পশ্চাতের মালিক। আপনি ব্যতীত সত্য প্রকৃত কোন ইলাহ্ নেই, অথবা (অপর বর্ণনায়) আপনি ব্যতীত প্রকৃত কোন সত্য মা’বূদ নেই।

সুফিয়ান (রহঃ) বলেছেন, আবূ উমাইয়্যাহ (রহঃ) তাঁর বর্ণনায় (আরবি বাক্যটি) অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন। সুফিয়ান (রহঃ)... ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) সূত্রে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেছেন।

সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১১২০
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস


দেখুন যে কি না আল্লাহর কত কাছের মানুষ! স্বয়ং রসূল(ﷺ) নিজেও নিজেকে মনে করিয়ে দিতেন যে, "আল্লাহ সত্য! কিয়ামত সত্য! রসূল সত্য! জান্নাত সত্য! জাহান্নাম সত্য!"

আমরা ইনসানরা খুব ভুলে যেতে পারি! যখন সব ভুলে যাই, মনে অস্থির লাগে, মনে মনে আওড়াতে থাকি - "আল্লাহ আপনি সত্য! আপনার ওয়াদা সত্য! আপনার জান্নাত সত্য! জাহান্নাম সত্য! কিয়ামত সত্য!" কি অদ্ভুত শান্তি লাগে তখন মনে! সুবহানআল্লাহ! আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন আমরা যেভাবে ভাইরাসকে সত্য মেনে না দেখেই ভয় করি, সেভাবে যেন ভাইরাসের প্রভুকেও সত্য মেনে না দেখে ভয় করতে পারি। সেই ভয়, ভালোবাসা আর আশা নিয়ে দুনিয়া আর আখিরাতের কল্যাণের দিকে কাজ করতে পারি। আমিন।

❒ রেফারেন্সঃ
১। সূরাহ বারাকাহঃ আয়াত ৩, ৪, ৫ - "যারা অদেখা বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রুযী দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে। এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেসব বিষয়ের উপর যা কিছু তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের উপর যা তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখেরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করে। তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথ প্রাপ্ত, আর তারাই যথার্থ সফলকাম"
সমাপ্ত

লেখাঃ শারিন সফি অদ্রিতা (আল্লাহ্‌ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!)

আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!

Post a comment

0 Comments