পার্থিব প্রতিযোগিতার মোহ তোমাদের অন্ধ করে রাখে


কর্পোরট লাইফের একটা অধুনা বিলাসিতা হচ্ছে: খাওয়া-দাওয়া,

— 'স্যার, আপনি নতুন জয়েন করেছেন,কাল খাওয়ান'
— 'ম্যাডাম, আপনি অমুক দিন অনুপস্থিত ছিলেন, খাওয়ান'
— 'আপনি আজ একটা ওটি করলেন, খাওয়ান'
— 'অমুক স্যারের তমুক পার্টি, চলেন খাই'
— 'বার্থডে, খাওয়ান'
— 'বিয়ে ঠিক হইছে, খাওয়ান'
— 'ম্যারেজডে, খাওয়ান'
— 'বাচ্চা হইছে, খাওয়ান'
— 'প্রমোশন হইছে, খাওয়ান'
— 'গুড নিউজ, খাওয়ান'

খাওয়ান খাওয়ান খাওয়ান খাওয়ান....

আচ্ছা, মানুষ কত খেতে পারে, বলেন দেখি? স্টোমাক যদি একটা ব্যাংকটাইপ কিছু হতো, তাহলেও বেশি খেয়ে ভবিষ্যতের জন্য স্টোর করে রাখা যেতো। একপেটে আর কত খাবেন? রেস্টুরেন্টে একসময় হাজার টাকার খাবার ইনপুট দিলেও দিনশেষে যে আউটপুট হবে, ঐ গরীব ভ্যানওয়ালার পুটিমাছের চচ্চড়ি, পান্তাভাতের আউটপুটও সেইম। লাভটা কোথায়?

দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষেরই 'চাওয়া' কিংবা 'চাহিদা'র আসলে ডেফিনিট কোন কারণ নেই, বলা চলে ফ্যান্টাসি, সবাই এভাবে চলছে তো আমিও চলি। আমার ৫টা বাড়ি আছে, আরও লাগবে। কারণ? জানা নেই। কোটি টাকা গুণে শেষ করতে পারিনা, তাও আরও চাই, কেন? জানা নেই। ঘরে ফ্রিজভর্তি খাবার, খাওয়ার রুচিটাও নেই, তবু হাজার টাকা রেস্টুর‍্যান্টে ঢালতে হবে, কেন? জানা নেই।

উত্তরটা আপনার জানা না থাকলেও আল্লাহ ঠিকই জানিয়ে দিয়েছেন, "

أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ ﴿١﴾
১। প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।

[১] أَلهَى يُلهِي শব্দের অর্থ হল গাফেল বা উদাসীন করে দেওয়া। تَكَاثُر অধিক কামনা করা বা প্রাচুর্য নিয়ে পরস্পর প্রতিযোগিতা করা। এ কথাটি ব্যাপক; প্রাচুর্যে মাল-ধন, সন্তান-সন্ততি, সহযোগী-পৃষ্ঠপোষক, বংশ-গোত্র প্রভৃতি সবই শামিল। প্রত্যেক ঐ বস্তু যার প্রাচুর্য ও আধিক্য মানুষের প্রিয় এবং যা অধিকভাবে পাবার প্রচেষ্টা ও কামনা মানুষকে আল্লাহর আহকাম এবং আখেরাত হতে উদাসীন করে দেয়, তাই উদ্দেশ্য এখানে। এ স্থানে আল্লাহ তাআলা মানুষের সেই দুর্বলতাকে ব্যক্ত করেছেন, অধিকাংশ মানুষ সর্বযুগে যার শিকার হয়ে থাকে।

حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ ﴿٢﴾
২। যতক্ষণ না তোমরা (মরে) কবরে উপস্থিত হও। [1]

[২] এর অর্থ হল, অধিকাধিক (মাল-ধন) উপার্জন করার উদ্দেশ্যে পরিশ্রম করতে করতে মৃত্যু তোমাদেরকে গ্রাস করে ফেলল এবং শেষ পর্যন্ত তোমরা কবরে গিয়ে পৌঁছলে!" [সূরাহ তাকাসুর, আয়াত : ১-২]

কিংবা হাদীসে এসেছে — "আদম সন্তানের মুখ কবরের মাটি ব্যতীত পূর্ণ হয়না।"

এই চাহিদা কিংবা প্রতিযোগিতা কিসের? খাওয়া-দাওয়া, গাড়ি-বাড়ি, টাকা-পয়সা, স্ট্যাটাস, মান-সম্মান, প্রোফাইল, ডিগ্রি-সার্টিফিকেট, বিউটি-সেক্স......

চাহিদার একটা লাগাম আছে, সেই লাগামটা টানা মানেই নাফসের লাগাম টানা, নাফস কে বোঝাতে হয়, যতবার নাফস সামনে ছুটতে চায় ততবার লাগাম টেনে ধরতে হয়, একটা সময় সে নিজেই বুঝতে পারে, ওদিকে গিয়ে লাভ নেই, কিংবা এক পা এগিয়েও দু'পা পিছিয়ে আসে, এই নাফসের নামই 'নাফসে লাউয়ামা'। আর এই লাগাম যত ছেড়ে দেবেন, ওটা বাড়তেই থাকবে: আলমারিভর্তি কাপড় থাকার পরও দোকানে গেলে মনে হবে, এই ড্রেসটা না কিনলেই নয়। বাজারে আই ফোনের লাস্ট মডেলটা আসলেই হাত উশখুশ করবে, নিজের পুরনোটা দিয়ে আর চলছেনা। ফ্রিজভর্তি খাবার থাকার পরও মনে হবে, এই বেলা বাইরে না খেলেই নয়, ধানমন্ডিতে দুটো বাড়ি থাকার পরেও মনে হবে গুলশানে একটা কেন নয়? এই লাগামহীন নাফসের নামই 'নাফসে আম্মারা বিস-সু', যেমন খুশি তেমন চলো, নগদ যা পাও হাত পেতে নাও বাকির খাতায় শূন্য থাক...

সবশেষে 'খাউকা' প্রজাতির উদ্দেশ্যে একটা হাদীস বলি, আল্লাহর রাসূল বলেছেন:
"আদম সন্তান যেসব পাত্র পূর্ণ করে তার মধ্যে পেট হচ্ছে নিকৃষ্টতম।" অথচ এই নিকৃষ্ট পাত্র পূর্ণ করার জন্য আমাদের কতই না আয়োজন!

আমাদের এই দ্বীনের সুন্নাত হচ্ছে, পেটের এক তৃতীয়াংশ খাবার, এক তৃতীয়াংশ পানি দিয়ে পূরণ করা আর বাকিটা খালি রাখা, নগদ যা পাই পেটে পুরে নিই, এই হিসেব দ্বীনের বেলায় চলেনা। সাহাবায় কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম এক তরকারির বেশি পেলে খাবারের পেয়ালা হাতে নিয়ে কেঁদে ফেলতেন: আমাদের পূর্বসুরীরা এসব পেয়ে যাননি, উনারা বোধহয় জান্নাতে আগে চলে গেলেন! কোন অভুক্ত মুসাফির দরজায় হাত পেতেছে, তো নিজেরা না খেয়ে শেষ খাবারটুকুও তার পাতে তুলে দিয়ে নিজেরা খাওয়ার মিথ্যে অভিনয় করেছেন। খেজুরের টুকরো মুখে নিতে গিয়ে ছুড়ে ফেলে জান্নাতের নেশায় ময়দানে ছুটেছেন।

সামান্য শুকনো খেজুর কিংবা পানি খেতে গিয়েও চিন্তিত হয়ে উঠতেন: এই খাবারের হিসেব দিতে পারবো তো?

প্রত্যেকটি নি'আমতের হিসেব সেইদিন গুণে গুণে দিতে হবে: অকারণে বিলাসিতায় খাওয়া কিংবা নষ্ট করা প্রতিটি খাবারের হিসেবও বুঝে দিতে হবে, দুনিয়ার লাখো কোটি অভুক্ত বনী আদমের হিসেব যাদের বেচে থাকার মত খাদ্যেরও যোগান নেই। আপনার রসনাবিলাস মেটাতে গিয়ে যেইসব পকেট থেকে অনিচ্ছা কিংবা অসাধ্য সত্ত্বেও শুধুই ভদ্রতার খাতিরে টাকা ঢালতে হয়েছে, সেই হিসেবটুকুও: হয়তো ঐ টাকাটি এমন কারও জন্যে রাখা ছিলো যে আপনার চেয়েও অভাবী, কিংবা এমন কোন কাজের জন্য যেই কাজের অবস্থান খাওয়ার চেয়েও অনেক উঁচুদরের...
সমাপ্ত

লেখাঃ নিশাত তামমিম (আল্লাহ্‌ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!)

আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ