ইবাদত করছি নাকি রিয়া করছি?

ইবাদত করছি নাকি রিয়া করছি?


ইবাদত করছি নাকি রিয়া করছি?

১) নামায শেষ করে উঠে যাওয়ার সময় জানতে পারলাম মেহমান চলে এসেছে। এজন্য মেহমান ঘরে প্রবেশ করা পর্যন্ত জায়নামাজে বসে থাকলাম। সম্পুর্ন ইচ্ছাকৃত না হলেও অবচেতন মন চাইছে নামায যে পড়তেছি মেহমান দেখুক!

২) কেউ জিজ্ঞেস করল--
আপনি কি করতেছেন,
উত্তরে বললাম- " আমি নামায পড়ে উঠে নাস্তা করতেছি বা নামায পড়ে উঠে
এখন রান্না করতেছি"!
এখানে শুধু নাস্তা বা রান্না করার কথা বললেই হতো, সাথে -"নামায পড়ে উঠে" কথাটি জুড়ে দিয়ে অতি সুক্ষভাবে নামাযকে প্রচারে নিয়ে আসা হল।

৩) ফজরে যে নামায পড়তে উঠলাম কিন্তু কেউ জানলো না, তাই সেটা মানুষকে জানানোর জন্য দিলাম ফেসবুকে একটা পোস্ট,

লিখলাম : "সবাই নামায পড়তে উঠুন"

আমি জানি আমার এই পোস্টে কারো ঘুম ভাংগবেনা বা কেউ দেখে নামাযে যাবেনা। তাও দিলাম। মোদ্দাকথা নামাযের ব্যাপারটা সবাইকে জানাইতেই হবে।

৪) নফল রোজা রেখে দুপুরে বন্ধুর সাথে চ্যাট করছি, হঠাত আউট অফ টপিক তাকে জিজ্ঞেস করেছি, " ভাত খেয়েছিস কিনা?" অথচ আজীবন তার ভাতের খবর নেয়নি,

সে হ্যা/না উত্তরের সাথে যে "তুই খেয়েছিস ?" এটা জিজ্ঞেস করবে সেটার গ্যারান্টি সূর্য উঠার মতই,

সে সুযোগে, " না দোস্ত রোজা রেখেছি" বলে রোজার প্রচার করে দিলাম।

৫) কুরবানির গরু কিনলাম, অফলাইনের আশেপাশের সবাই দেখলেও অনলাইন বন্ধুদের সামনে তো আর শো আপ করা হলো না।

তাই প্রাইভেসি পাবলিক করে দিয়ে দিলাম পোস্ট, "আলহামদুলিল্লাহ্‌ Done"

লাইক, লাভের ছড়াছড়িতে বন্যা বয়ে গেছে, অনেকেই দেখি দাম জিজ্ঞেস করল, সেই সুযোগে জিতা - হারার প্রচারটাও হয়ে গেল।

৬) বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার সময় মজার ছলেই টেকনিকে বলে দিলাম,
"তুই বেটা কিপটা, কিছুই দান করিস না!"

প্রতিউত্তরে, " তুই কি দান করে উল্টিয়ে ফেলছিস?" এই প্রশ্নটা যে করবে তা জানুয়ারির পর ফেব্রুয়ারি আসার মতই নিশ্চিত আমি।

সাথে সাথেই দিয়ে দিলাম আমার দানের লিস্ট, সম্পূর্ণ ডিটেল সহকারে।

আমার এই দান পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে প্রচারের জন্য আমার স্ত্রী তো আছেন ই।

কি জুশ না?

উপরের প্রত্যেক উদ্দীপক পড়ে কিছু আয়ত্ত করতে পারলেন কি?

এতক্ষণ যে ইবাদত গুলো করলাম সেগুলা কি আল্লাহর জন্য নাকি লোক দেখানো?

কখনো ভেবেছেন? এসব ইবাদত আদৌ কবুল হবে কি?

উপরোক্ত প্রত্যেকটি ইবাদত ই হলো "রিয়া"

রাসুলুল্লাহ (সা.) রিয়াকে ছোট শিরক (আল্লাহর অংশীদার নির্ধারণ) বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে ছোট শিরক নিয়ে যতটা ভয় পাচ্ছি, অন্য কোনো ব্যাপারে এতটা ভীত নই।’ তাঁরা (সাহাবি) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, ছোট শিরক কী? তিনি বলেন, রিয়া বা প্রদর্শনপ্রিয়তা। আল্লাহ কিয়ামতের দিন বান্দার আমলের প্রতিদান প্রদানের সময় বলবেন, ‘তোমরা পৃথিবীতে যাদের দেখাতে তাদের কাছে যাও। দেখো তাদের কাছে তোমাদের কোনো প্রতিদান আছে কি না?[১]

পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ লোক-দেখানো ইবাদত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি তার প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন সৎ কাজ করে এবং তার প্রভুর ইবাদতে কাউকে অংশীদার না করে।’ [২]

অন্য আয়াতে যারা লোক-দেখানো ইবাদত করে তাদের নিন্দা করে বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস সেসব নামাজির জন্য, যারা তাদের নামাজের ব্যাপারে উদাসীন, যারা প্রদর্শন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস দেওয়া থেকে বিরত থাকে।’ [৩]

উল্লিখিত আয়াত ও হাদিসের আলোকে ইসলামী জ্ঞানতাপসরা রিয়াকে কবিরা গুনাহ (বড় পাপ) ও হারাম বলেছেন। আল্লামা ইবনে কায়্যিম (রা.) কবিরা গুনাহের তালিকার প্রথমে রিয়ার আলোচনা করেছেন। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেছেন, ‘জেনে রাখো, নিশ্চয় প্রদর্শনপ্রিয়তা হারাম। প্রদর্শনকারী আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয়। আয়াত, হাদিস ও পূর্ববর্তী আলেমদের বক্তব্য দ্বারা তা প্রমাণিত।’ [৪]

বান্দার আমলে রিয়া যদি ইচ্ছাকৃত হয়, তবে তা যত গৌণই হোক—সে আমল আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি শরিককারীদের শরিক থেকে অমুখাপেক্ষী। যে ব্যক্তি কোনো আমল করল এবং তাতে আমার সঙ্গে কাউকে শরিক করল, আমি তাকে ও যাকে সে শরিক করল তাকে প্রত্যাখ্যান করি।’[৫]

তবে রিয়া যদি অনিচ্ছায় হয়, বান্দা তা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করে এবং এ জন্য অনুতপ্ত হয়, তবে গ্রহণযোগ্য মত হলো, এমন ইবাদত আল্লাহর দরবারে প্রত্যাখ্যাত হবে না। ব্যক্তি ইবাদতের দায় থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। তবে তার প্রতিদান কী হবে, তা আল্লাহই ভালো জানেন।

আল্লাহ আমাদের রিয়ামুক্ত ইবাদতের তৌফিক দান করুক। আমিন

লেখাঃ রাহাত তাসনিল (আল্লাহ্‌ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!)

ফুটনোট :
[১] : (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২২৫২৮)
[২] : (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ১১০)
[৩] :(সুরা : মাউন, আয়াত : ৪-৭)
[৪] : (ইহয়াউ উলুমিদ্দিন : ২/৪৮০)
[৫] : (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩৫২৮)

আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!

Post a comment

0 Comments